Thursday, November 12, 2015

আমাদের বাদশাহ নামদার

অনেক বছর আগের কথা। আশির দশকের শুরুর দিক। থাকতাম তখন খিলগাঁওয়ে। কিশোর বয়স আমার। গল্পের বই পড়ার প্রবল নেশা তখন। কিন্তু নেশার উপকরণ নেই। অত্যন্ত দরিদ্র একটা পরিবারে জন্ম আমার। একবেলা খাবার পরে পরের বেলা খাবার জুটবে কি না, সেই দুশ্চিন্তা যেখানে কুরে কুরে খায়, সেখানে বই নামের নেশাতো অন্যভূবনের উপকরণ। ভাত খাবারই পয়সা নেই যেখানে, সেখানে বই এর আশাতো দূরাশামাত্র। তবে, শুধু অর্থনৈতিক কারণই একমাত্র কারণ ছিল না এই প্রতিবন্ধকতার পিছনে। পরিবারের কর্তার গড়পড়তার চেয়ে নিম্নমানের বুদ্ধিমত্তার কারণে পাঠ্য বইয়ের বাইরের সব বইকেই ধরা হতো আউট বই হিসাবে। আমার জনক এমন ঘেন্নার সাথে নাটক-নভেল পড়ে কথাটা বলতেন যে, সেটা শুনলে মনে হবে যেন উপন্যাস পড়াটা পৃথিবীর জঘন্যতম কোনো কাজ। এই পশ্চাদপদ মানসিকতার বদমেজাজী গৃহকর্তাটির ভয়ে আমাকে অনেক লুকিয়ে চুরিয়ে বই পড়তে হতো। কখনো লেপের নীচে লুকিয়ে, কখনই পাঠ্য বইয়ের নীচে রেখে, কখনো বা তিনি যখন বাসায় থাকতেন না সেই সুযোগে, কখনো বা আব্রাহাম লিংকনের মত সন্ধ্যার পরে বাইরে কোনো ল্যাম্পপোস্টের নীচের আধো আলো আধো অন্ধকারে বসে। গল্পের বইসহ কখনো হাতেনাতে ধরা পড়লে বইয়ের জীবনতো পুরোপুরি শেষ হতোই, আমারটাও পিটিয়ে আধমরা করে ছাড়তেন আমার আব্বাজান।
তখন মূলত সেবার বই পড়তাম। দস্যু বনহুর, দস্যু বাহরাম আর নীহাররঞ্জনের কীরিটি রায় পেরিয়ে আমার উত্তরণ ঘটেছে মাসুদ রানায়। কিন্তু, এই বইগুলো ছিল অনেক দুর্লভ। সেবার বই, বিশেষ করে মাসুদ রানাকে তখন প্রাপ্তবয়ষ্কদের বই মনে করা হতো। আমাদের মত কিশোরদের হাতে এই বই দেখলে বড়রা সবাই হাহা করে উঠতো এই বলে যে, দেশ, সমাজ সব একেবারেই রসাতলে গেলো। কেউ বা কান মুচড়ে কেড়ে নিতেন হাত থেকে, বদরাগী কেউ হয়তো সমাজটাকে উচ্ছন্নে যাওয়া থেকে রক্ষা করার মহান উদ্দেশ্যে আমাদের গালে সজোরে চড় কষে দিতেন। আমাদের সমবয়েসী কেউ-ই তখনো মাসুদ রানা কেনার দুঃসাহস দেখায় নি। তারপরেও আমার হাতে মাসুদ রানা এসে পড়েছিল একজন বয়ষ্ক লোকের কল্যানে। আমাদের এক বন্ধুর বাসায় তাদের দূর সম্পর্কের এই লোকটি আশ্রিত অবস্থায় থাকতেন। আমাদের বন্ধুটি জ্যাঠা বলে ডাকতো। তার দেখাদেখি পাড়ার সব কিশোরেরাই তাকে জ্যাঠা বলে ডাকতাম। এই জ্যাঠার মাসুদ রানা পড়ার বাতিক ছিল। তখন প্রতিমাসে একটা করে মাসুদ রানার বই বের হতো। জ্যাঠা প্রতিমাসে নিয়ম করে সেই মাসুদ রানাটি কিনতেন। এই জ্যাঠার সংগ্রহশালা থেকেই আমার মাসুদ রানা পড়ার শুরু। তবে, জ্যাঠাও অনেক সময়ে জ্যাঠামি করতেন। বই আনতে গেলে তিনি সব বই নিতে দিতেন না। এইটা পড়ে তুমি বুঝবা না, কঠিন হয়ে যাবে, এইরকম একটা না একটা অজুহাতে মাসুদ রানার অনেক বই-ই তিনি আমাকে পড়তে দিতেন না। তারপরেও যে দুই চারটা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম, তাতেই নেশা ধরে গিয়েছিল আমার।
নেশা মেটানোর সুযোগ সীমিত। তাই মনমরা হয়ে এর ওর কাছ থেকে ধার করে পানসে পানসে বই পড়ে দিন কাটছিল আমার। ঠিক এরকম সময়েই খোঁজ পেলাম যে অন্য পাড়ায় এক ছেলে বই ভাড়া দেয়। তার কাছে মাসুদ রানার সব বই-ই আছে। শোনামাত্র ওই বাসা চেনে এমন একজনকে পাকড়াও করে হাজির হলাম সেখানে। আসলেই অনেক বই। দুটো শেলফ ভর্তি থরে থরে করে সাজানো। ইচ্ছামত যেটা খুশি সেটা নেওয়া যায়। কোনো ধরণের সেন্সরশীপের ব্যাপার-স্যাপার নেই।
একটা ডিপোজিট দিয়ে একাউন্ট খুললাম। কত টাকা দিয়েছিলাম, এখন আর খেয়াল নেই। কত ভাড়া ছিল বইগুলোর তাও মনে নেই এখন আর। আট আনা বা এক টাকা করে হবে হয়তো। মোটামুটি আয়ত্তের মধ্যে। পয়সা দিয়ে বই কেনার মত অসহনীয় এবং ক্ষমতার বাইরের ব্যাপার নয়।
ওখান থেকে বই এনে নেশা মিটাচ্ছিলাম নিয়মিতভাবেই। একদিন ওই বাসায় গিয়ে একটা নির্দিষ্ট বই খুঁজছিলাম। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওই সময় ওই ছেলে হঠাৎ একটা শক্ত বাধাই এর বই দেখিয়ে বলে যে, এই বইটা পড়েছো। একজন নতুন লেখকের লেখা। অনেক সুন্দর। এটা নিতে পারো। আমার তখন বই এর বিষয়ে এই ধারণা যে, পেপারব্যাক বই মানেই হচ্ছে আসল বই, উত্তেজনাকর বই। বাধাই বই মানেই হচ্ছে নিরস ধরণের সামাজিক বই। পয়সা দিয়ে এটা নেওয়ার চেয়ে মাসুদ রানার আরেকটা বই নেওয়াটা আমার জন্য অনেক বেশি আকর্ষণীয়। আমার মনের ভাবনা আর অনিচ্ছা টের পেয়েই তড়িঘড়ি করে ছেলেটা বলে যে, এর জন্য তোমাকে পয়সা দিতে হবে না। আমি ফ্রি দিচ্ছি। পড়ে ফেরত দিয়ে যেও। বইটা ছিল হুমায়ূন আহমেদের লেখা নন্দিত নরকে। আজকে এতদিন পড়ে ছেলেটার অনুভূতিটা টের পাই। কোনো ভালো বই পড়লে, এটা অন্যকে পড়ানোর জন্য এক ধরণের আকুলিবিকুলি প্রায় সব মানুষের মধ্যেই তৈরি হয়। তবে, ছেলেটার একটা কথা ঠিক ছিল না। বলেছিল যে, নতুন লেখকের নতুন বই। এই বইটা হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন একাত্তর সালে। বই আকারে কবে প্রকাশ হয়েছে তা জানি না। বইটা লেখার এক দশকেরও পরের সময়ে একে আর নতুন বই বলা যায় না। কিন্তু, তখন পর্যন্ত এটা মানুষের চোখের আড়ালে ছিল বলেই হয়তো বইটাকে নতুন বলে মনে হয়েছিল ছেলেটার কাছে।
বাসায় এসে আগে মাসুদ রানাগুলো শেষ করি। সবশেষে শুধু কিছু করার নেই এবং বই পড়ার নেশার কারণে হাতে তুলে নেই নন্দিত নরকে। নরক থেকে একটানে এই বই তুলে আনে আমাকে স্বর্গরাজ্যে। এর আগেও অনেক বই পড়ে কেঁদে ভাসিয়েছি আমি। কিন্তু এই প্রথম বই পড়াকালীন কান্নার সাথে সাথে অদ্ভুত ধরণের এক দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা ছেয়ে ধরে আমাকে। বুকের মধ্যে চেপে ধরা কষ্ট নিয়ে বেশ অনেকগুলো দিন কাটে আমার। এই বইগুলো ফেরত দেওয়ার সময়ে ওই ছেলে জিজ্ঞেস করে, কেমন লেগেছে বইটা? খুব ভালো বলতেই উজ্জ্বল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে যায় তার মুখ। বলে যে, এই লেখকের আরেকটা বই আছে। সেটা এরকমই সুন্দর। নেবে? এবার আর কোনো দ্বিধা নেই আমার। সঙ্গে সঙ্গেই বগলদাবা করে ফেলি ওটাও। আগেরটার মতই অসম্ভব সুন্দর একটা কাব্যিক নাম। শঙ্খনীল কারাগার।
শঙ্খনীল কারাগার পড়েও সেই একই অনুভূতি আমার। একই রকমের চাপা কষ্ট বুকের ভিতরে, একই রকমের বিষণ্ণতা জেকে বসা হৃদয় জুড়ে। আজ এতদিন পরেও জানি না, দুটো বই পড়ে একই রকমের অনুভূতি কেন হয়েছিল? অন্যদের কী রকম হয়? জানি না। তবে আমার কাছে নন্দিত নরকে আর শঙ্খনীল কারাগার জমজ উপন্যাস বলে মনে হয়েছে সবসময়ই। দুটোর লেখার স্টাইল, বিষয়বস্তুর মিলতো রয়েছেই, দুটো উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ চরিত্রগুলোর হুবহু একই নাম রেখেছেন। হতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ে তিনি দুটো উপন্যাসকে লিখেছিলেন। সেকারণেই একই আদলে গড়ে উঠেছে উপন্যাস দুটি।
এই দুটো উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত তরুণ বয়সের লেখা উপন্যাস। কোনটা প্রথম আর কোনটা দ্বিতীয় বলা মুশকিল। যতদূর মনে পড়ে হুমায়ূন আহমেদ কোথায় যেন বলেছিলেন যে, নন্দিত নরকে ছাপা হয়েছে আগে, কিন্তু শঙ্খনীল কারাগার লেখা হয়েছিল নন্দিত নরকের আগে। সে কারণেই আমি এই দুটোকে একসাথে তাঁর প্রথম উপন্যাস বলে বিবেচনা করে থাকি। মজার বিষয় হচ্ছে যে, অপরিণত বয়সে লেখা এ দুটো উপন্যাসই হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এই দুটো উপন্যাসের পরে যদি তিনি আর কিছু না লিখতেন, তবে বাংলা সাহিত্য তাঁকে পুজো করতো অসামান্য প্রতিভাবান একজন মানবিক লেখক হিসাবে। তাঁর দুর্ভাগ্য তিনি আরো অসংখ্য উপন্যাস লিখেছিলেন, যেগুলোর বেশ কিছু ভালো মানের আর অধিকাংশগুলোই বস্তাপচা। এই বস্তাপচাগুলোর ক্ষোভেই লোকে তাঁকে নামিয়ে দিয়েছে সাধারণ একজন লেখকের কাতারে। অথচ তারা ভুলে গেছে যে, শঙ্খনীল কারাগার আর নন্দিত নরক ছাড়াও তিনি লিখেছেন মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, কবি, মাতাল হাওয়া, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, বাদশাহ নামদার, শ্যামল ছায়ার মত উপন্যাসসমূহ। হুমায়ূন আহমেদের সেরা দশটি উপন্যাস বাছাই করে নিয়ে এক পাল্লায় ফেলে যদি বলা হয় যে গত চল্লিশ বাংলাদেশের বাকি সব সাহিত্যিকদের সব লেখা থেকে বাছাই করে নিয়ে এসে অন্য পাল্লায় ফেলা হোক, আমার নিশ্চিত বিশ্বাস হুমায়ূন আহমেদের পাল্লাই ভারি হবে। তারপরেও এই ভদ্রলোককে নিয়ে আমাদের কত কত আজেবাজে কথা। তার সৃষ্টির সাহিত্যমূল্য দিতে কী অপরিসীম কার্পণ্য আমাদের।
নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগারের পরে দীর্ঘদিন তিনি আর কিছু লেখেন নি। বিদেশে ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন তাঁর হাত শূন্য। এই সময়েই কেউ একজন তাঁকে পরামর্শ দেয় কাজী আনোয়ার হোসেনের কাছে যেতে। সেবা প্রকাশনীই বাংলাদেশের একমাত্র প্রকাশনী যারা বাড়িতে গিয়ে হলেও লেখকদের দেনা-পাওনা মিটিয়ে দেয়। কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে দেখা করার পরে তাঁর হাতে গছিয়ে দেওয়া হয় এ জে কুইনেলের ম্যান অন ফায়ার বইটি। এই বই অবলম্বনে একটা থ্রিলার উপন্যাস লিখে দেবেন হুমায়ূন আহমেদ, এটাই ছিল প্রত্যাশা। এই বইয়ের অনুসরণে হুমায়ূন আহমেদ ছোট্ট একটা উপন্যাস লেখেন অমানুষ নামে। এটি দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল রহস্য পত্রিকায়। হুমায়ূন আহমেদের এই কাজে সন্তুষ্ট হতে পারেন নি কাজী আনোয়ার হোসেন। পরে তিনি এটাকে অবলম্বন করে মাসুদ রানা সিরিজে বই লেখেন অগ্নিপুরুষ নামে। অগ্নিপুরুষ রানা সিরিজের অন্যতম সেরা একটা বই। কাজী আনোয়ার হোসেন হুমায়ূন আহমেদের কাজে অসন্তুষ্ট হলেও তাঁদের মধ্যে সম্পর্কচ্যূতি ঘটে নি। হুমায়ূন আহমেদের প্যারাসাইকোলজির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা সিক্যুয়েল উপন্যাস দেবী এবং নিশীথিনী প্রথম পেপারব্যাকে প্রকাশিত হয় সেবা থেকেই। এই দুই উপন্যাস দিয়েই জন্ম হয় বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ এক চরিত্র মিসির আলীর। সুকঠিন যুক্তিবাদী এবং অসাধারণ কোমল মনের একজন মানুষ তিনি।
শুধু মিসির আলীই নয়, হুমায়ূন সৃষ্টি করেছেন হিমুর মত এক অযুক্তিবাদী চরিত্র। হিমু আর কেউ নয়, মিসির আলীরই বিপরীত চরিত্র। মিসির আলীর প্রতিটা কাজ যেখানে হিসেবী, হিমু সেখানে চরম বেহিসেবী এক চরিত্র। মিসির আলী যেখানে যুক্তির বাইরে এক পাও নড়েন না, হিমু সেখানে নির্দ্বিধায় অযৌক্তিক কাজ-কারবার করে বেড়ায়। মিসির আলী বা হিমুর বাইরে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুভ্র নামের এক অসম্ভব রূপবান তরুণকে। যে তার নামের মতই শুচিশুভ্র, পবিত্র। জগতের কোনো কালিমা তাকে স্পর্শ করে নি।
এগুলো হচ্ছে সিক্যুয়েলের চরিত্র। একটা মাত্র বইয়ে এরা সীমাবদ্ধ নয়। এই চরিত্রগুলো নিয়ে তিনি অসংখ্য বই লিখেছে। এর বাইরেও অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র এঁকেছেন তিনি। তাঁর সৃষ্ট অয়োময়ের মির্জা, লাঠিয়াল সর্দার, কোথাও কেউ নেই এর বাকের ভাই বা মুনা, বহুব্রীহির মামা, নান্দাইলের ইউনুস, এইসব দিনরাত্রির টুনি, নন্দিত নরকের রাবেয়া বা মণ্টু আমাদের মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে আছে।
আশির দশক হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের দশক। এই এক দশকেই তিনি পালটে দিয়েছেন অনেক কিছু। একের এক বই লিখে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে গেছেন তিনি। হুহু করে বিক্রি হয়েছে তাঁর বই। তৈরি হয়েছে অসংখ্য পাঠক সারাদেশ জুড়ে। এর আগে বাংলাদেশের বাজার ছিল পশ্চিম বঙ্গের বুদ্ধিবেনিয়াদের দখলে। হুমায়ূন একাই সবগুলোকে কুপোকাত করে ছাড়েন। বাংলাদেশের মানুষ আগে বাংলাদেশের লেখকদের বই কিনতো না, কিনতো পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের বই। হুমায়ূন সবাইকে ধাক্কিয়ে পিছনের সারিতে নিয়ে যান। বই মেলা জমে উঠে হুমায়ূনের বই দিয়ে।
আশির দশকের শেষের দিকে আর নব্বই এর শুরুর দিকে আন্নার সাথে চুটিয়ে প্রেম করছি আমি। ওকে খুশি করার জন্য নানান রকমারি উৎসবের দিনে বই উপহার দিয়েছি তখন। এর সবগুলোই হুমায়ূন আহমেদের বই। সাত বছর আগে শেষবারের মত দেশে গিয়েছিলাম আমি। গিয়ে দেখি আমার শ্বশুরবাড়িতে সেগুলো খুব যত্নে আরো অনেক বইয়ের সাথে রাখা। ওই বইগুলো খুলে আমার কানটান লজ্জায় লাল হবার দশা। সব বইয়ের শুরুতে প্রথম তারুণ্যের ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে রোম্যান্টিক রোম্যান্টিক কি সব কথাবার্তা লেখা রয়েছে। বিব্রত হয়ে আমি আন্নাকে বলি যে, এগুলো কি আমি লিখছিলাম। ও গলায় নিমের শরবত ঢেলে বলে যে, জ্বী, জনাব। আপনিই ওইগুলো লিখছিলেন। তখনতো প্রেমিকা ছিলাম। কোকিলের কুহুতান বের হতো আপনার গলা দিয়ে। এখন বান্দি হইছি। তাই কাকের মত কর্কশ চিৎকার বের হয়। আমাকে দূর করতে পারলেই বাঁচেন আপনি।
তাঁর হাত দিয়েই প্রথম বেরিয়ে আসে বাংলাভাষার সত্যিকারের সায়েন্স ফিকশন। অনেকেই হয়তো আশ্চর্য হবেন। এই কৃতিত্বটা মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে দিতেই উন্মুখ আমরা। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে বাংলা ভাষার সত্যিকারের কল্পবিজ্ঞান লেখার জনক তিনি। তাঁর লেখা তোমাদের জন্য ভালবাসা, ফিহা সমীকরণ কিংবা  ইরিনা মন কেড়ে নেবার জন্য যথেষ্ট।
শুধু বইয়ের জগত নয়। টেলিভিশনও দখল নিয়ে নেন তিনি। একের পর এক জনপ্রিয় ধারাবাহিক রচনা করে মাত করে দেন মধ্যবিত্তকে তিনি। টিভি নাটকে সত্যিকারের হাস্যরসও তাঁর অবদান। তাঁর আগে আমজাদ হোসেন জব্বার আলী নামের এক অখাদ্য এবং স্থূল রুচির নাটক দিয়ে ভাঁড়ামো করে লোক হাসানোর চেষ্টা করতেন। হুমায়ূন আহমেদ এসে দেখিয়ে দিলেন সূক্ষ্ণ রসবোধ কাকে বলে। তাঁর নাটক দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে নি, এমন লোক ওই দশকে একজনও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে।
তবে এগুলোর কোনোটাই নয়। আমার কাছে হুমায়ূনের সেরা কাজ হচ্ছে তাঁর ছোটগল্প। অন্যসব বিশাল কাজের ডামাডোলে খুব নীরবে তিনি লিখে গেছেন অসংখ্য অসাধারণ ছোটগল্প। গত চল্লিশ বছরে তাঁর সমতুল্য কেউ আসে নি এই ক্ষেত্রে। কোনো যাদু বাস্তবতা নয়, নয় কোনো পরীক্ষা নিরিক্ষা, খুব সহজ সরল ভাষায় সাধারণ সব মানুষকে চরিত্র করে অনন্য সব গল্প লিখে গেছেন তিনি।  চোখ, জলিল সাহেবের পিটিশন, ১৯৭১ এর মত গল্পগুলো অনেক অনেক বছর পরে তাঁদের সঠিক মূল্যায়ন পাবে বলেই আমার বিশ্বাস।
হুমায়ূন আহমেদের মানের পতন ঘটেছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠার পরে। এর জন্য আমি কোনো দোষ দেই না। জনপ্রিয় একজন সাহিত্যিককে অনেক চাপ সামলাতে হয়। অসংখ্য লোক লেখার বায়না নিয়ে বসে থাকে। কেউ কেউ অগ্রিম টাকা পর্যন্ত দিয়ে আসে জোর করে। এইসব ফরমায়েশি লেখার মান এর থেকে ভালো কিছু হবার কথা নয়। সে কারণেই তিথির নীল তোয়ালে বা হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্মের মত আবর্জনা তৈরি হয়। এই সমস্যাতে শুধু হুমায়ূন আহমেদ না, তসলিমাকেও পড়তে দেখেছি আমরা। তসলিমার প্রায় সব উপন্যাসগুলোই ফরমায়েশি লেখা। প্রকাশকরা লেখার আগেই জোর করে টাকা রেখে যেতো তসলিমার বাসার টেবিলের উপর। সে কারণেই আমরা দেখি তসলিমার উপন্যাসগুলোর কী করুণ দশা।
তবে, এই সমস্ত লেখার জন্য কোনো ভাণ-ভণিতা হুমায়ূন আহমেদ কখনোই করেন নি। লেখা দিয়ে সমাজ পালটে দিতে হবে, এই সমস্ত সস্তা চটকদার সংলাপে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে তবে আমার মনে পড়ে যে একসময় কয়েকটা নাটকের শুরুতে তিনি বিদ্রুপ করে লিখে দিয়েছিলেন যে, এখানে শিক্ষণীয় কিছু নেই। তাঁর একটা বই দেখে একবার আহমেদ ছফা (বেজায় ঠোঁটকাটা লোক ছিলেন তিনি) তাঁকে সরাসরি বলেছিলেন যে, এই সব ছাইপাশ লিখছেন কেন? হুমায়ূন আহমদে কোনো মিথ্যা অজুহাত তৈরি করেন নি। সরাসরি বলেছিলেন যে, টাকার জন্য লিখেছি। ওটা লিখে যে টাকা পেয়েছি তা দিয়ে বাচ্চাদের জন্য রঙিন টেলিভিশন কিনেছি। এরকমই স্পষ্টভাষী ছিলেন তিনি।
একটা জিনিস এখানে বলে যাই। হুমায়ূন আহমেদের বইগুলোর মধ্যে প্রিয় কোনটা জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগ লোকই নন্দিত নরকে আর শঙ্খনীল কারাগারের কথা বলবে। আমার এ দুটো অবশ্যই পছন্দের। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেরা পছন্দ হচ্ছে আগুনের পরশমণি নামের মাঝারি আকৃতির উপন্যাসটি। এই উপন্যাসের পটভূমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকায় আরবান গেরিলাদের আক্রমণ উঠে এসেছে এখানে। একজন নির্লিপ্ত আরবান গেরিলার এক নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে শহরে নানান ধরণের আক্রমণ পরিচালনার গল্প এটি। কী যে দারুণ মুন্সিয়ানা আর দরদ দিয়ে হুমায়ূন ফুটিয়ে তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযোদ্ধাদের আর দেশের প্রতি মমতা মাখানো সাধারণ মানুষদেরঅতুলনীয়। কত কত অসংখ্যবার যে আমি পড়েছি এই উপন্যাসটা তার ইয়ত্তা নেই। কত যে চোখের কোণ ভিজেছে আমার উপন্যাসটা পড়তে গিয়ে তার কোনো হিসেব নেই আমার কাছে। এক সময় স্বপ্ন দেখতাম ফিল্ম বানাবো। যদিও এর ধারে কাছেও যাওয়া হয় নি আমার। ওই স্বপ্নের সাহসেই হয়তো মনে মনে এই উপন্যাসের চিত্রনাট্য সাজাতাম আমি। একদিন হুট করে শুনি হুমায়ূন আহমেদ নিজেই এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর ঘোষণা দিয়েছেন। একজন প্রথিতজশা সাহিত্যিক, যাঁর চলচ্চিত্র বানানোর কোনো অভিজ্ঞতা, শিক্ষা বা অতীত আগ্রহ নেই, নিজের উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোতে নেমে পড়াটা একটা বিরল ঘটনা।
পরিচালক হবার জন্য এফডিসিতে বিভিন্ন পরিচালকদের সমন্বয়ে গড়া একটা বোর্ডের সামনে তাঁকে পরীক্ষাও দিতে হয়েছিল। সেই পরীক্ষায় তেত্রিশ পেয়ে কোনো রকমে পাশ করেছিলেন তিনি। ফেলই করার কথা ছিল অবশ্য। তাঁকে চাষী নজরুল ইসলাম প্রশ্ন করেছিলেন যে, একজন পরিচালকের কী কাজ? এর উত্তরে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন যে, কিছু না, শুধু নায়িকার সাথে ফস্টিনস্টি করা। এই উত্তরের পরে তাঁকে যে পাশ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এটা ভাগ্য। ভাগ্য বলছি এ কারণে যে, আগুণের পরশমণি ছাড় পাবার পরে তা শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসাবে জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছিল। সৃষ্টিশীলতা যে পাঠ্যবই পড়ে হয় না, বা পরীক্ষা পাশ করে হয় না, এই বিষয়টা আমাদের শিল্পাঙ্গনের লোকেরাও মনে হয় জানেন না।
আমার অবশ্য এই ছবিটা বেশি পছন্দ হয় নি। আগুনের পরশমণি উপন্যাস হিসাবে যে রকম, ঠিক সেই আমেজটা আমি চলচ্চিত্রে পাই নি। চাঁদ, জোছনা, বৃষ্টি এগুলোর প্রতি হুমায়ূন আহমেদের অতিরিক্ত প্রীতি আর চরিত্র অনুযায়ী শিল্পী নির্বাচনের ব্যর্থতা চলচ্চিত্রের গতিকে ব্যহত করেছে। তাঁর সব চলচ্চিত্রের মধ্যে, আমার মতে, সেরা কাজ হচ্ছে শ্রাবণ মেঘের দিন। এইটা একটা সিনেমা বটে। কী যে দরদ দিয়ে বানিয়েছেন তিনি এই চলচ্চিত্রটি।
জোছনা আর বৃষ্টির গল্প যখন এলো, তখন একটু বলেই ফেলি। আজকে বাংলাদেশে তরুণ তরুণীদের মধ্যে জোছনাস্নাত হওয়া বা বৃষ্টিস্নাত হওয়ার যে একটা রোম্যান্টিক ভাবনা ব্যাপকভাবে কাজ করে, এর পিছনে একক অবদান হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের। তাঁর অত্যন্ত শখের এই জিনিসগুলো তিনি বার বার তাঁর গল্প, উপন্যাস, নাটক আর চলচ্চিত্রে ব্যবহার করে, এই সময়ের ছেলেমেয়েদের মগজের মধ্যে তা গেথে দিয়েছেন। মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তার অপরিসীম। সে কারণে আজকাল অনেক ছেলেপেলে হিমুর মত হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাজপথে হেটে যায়।
আমি সাহিত্যবোদ্ধা নই। খুব বেশি সাহিত্যপঠনও আমার হয় নি। কিন্তু, অসংখ্য সাহিত্যিকের বইয়ের গাদা থেকে বই বাছাই করে আমাকে যদি পড়তে বলা হয়, তবে আমি প্রথমে তিনজন লেখকের বই বেছে নেবো। এই তিনজন হচ্ছেন হুমায়ূন আহমেদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এবং কাজী আনোয়ার হোসেন। নাহ! এই তিনজনকে আমি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলে মনে করি না। কিন্তু এই তিনজনের ভয়ংকর শক্তিশালী একটা অস্ত্র আছে, যা বাংলা ভাষার অন্য অনেক সাহিত্যিকের নেই। সেটা হচ্ছে ভাষা। এই তিনজনের গদ্যশৈলী অসম্ভব ঝরঝরে, ছুটে চলা ঝরনার মত ঝিরঝির বহমান, অতি সাদামাটা, আটপৌরে, অলংকরণ শূন্য, নিরাভরান, বাহুল্যবর্জিত ছিপছিপে মেদহীন, কিন্তু মোনালিসার হাসির মতই মোহনীয়, সম্মোহনশক্তিসম্পন্ন। বইয়ের প্রথম লাইন পড়লে আর থামা যায় না। অনেকটা সিডনি শেলডনের বইয়ের মত। ভাষাই টেনে নিয়ে যেতে থাকে লাইন থেকে লাইনে, পৃষ্ঠা থেকে অন্য পৃষ্ঠায়, এক বই থেকে আরেক বইয়ে।
জীবনের শেষ দিকে এসে তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে খুব বেশি টানাটানি করেছে লোকে। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন যে তাঁর নিজস্ব একটা বিষয়, সেই বোধটা আমাদের অনেক লোকের মধ্যেই খুব একটা বেশি নেই। আমরা আমাদের নৈতিকতার স্ট্যান্ডার্ডকে দাঁড় করিয়ে দেই একজন সফল মানুষের সামনে। তারপর সেই মাণদণ্ড দিয়ে বিচার করতে চাই তাঁর জীবনকে। হুমায়ূন আহমেদ কেন মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করলো, কেন এতো প্রেম করে বিয়ে করা  আর চার সন্তানের জননী স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে ওই কচি মেয়েকে বিয়ে করলো, ইত্যাকার নানান সমালোচনায় তাঁর জীবনটাকে বিষিয়ে দিয়েছে মানুষ। এগুলো যে তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়, সেই বোধটা কারো মধ্যে জন্মায় নি কখনো। তাঁর এই নৈতিক অধঃপতনও (!) তাঁর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং অসংখ্য সমালোচক তৈরি হবার অন্যতম একটা কারণ।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বাদশাহ নামদার উপন্যাসের ভূমিকাতে হুমায়ূনকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এভাবেঃ
হুমায়ূন অতি বিচিত্র এক চরিত্র। যেখানে তিনি সাঁতারই জানেন না। সেখানে সারা জীবন তাঁকে সাঁতরাতে হয়েছে স্রোতের বিপরীতে।সম্রাট হুমায়ূন বহুবর্ণের মানুষ। তাঁর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে আলাদা রঙ ব্যবহার করতে হয় নি। আলাদা গল্পও তৈরি করতে হয় নি। নাটকীয় সব ঘটনায় তাঁর জীবন পূর্ণ।আমাদের এই হুমায়ূনেরও তাই। নাটকীয় সব ঘটনায় তাঁর জীবন পূর্ণ। বর্ণিল তাঁর কর্মকাণ্ড। এখানে তাঁকে ফুটিয়ে তুলতে আমার আলাদা কোনো ব্রাশ দিয়ে রঙ ছড়াতে হয় নি। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই এমন সাতরঙের সমাহার যে, তিনি আপন বৈশিষ্ট্যেই ফুটে উঠেছেন এখানে।

আজ অনেকদিন পর বাদশাহ নামদার বইটা খুলতে গিয়ে একটা জিনিস চোখে পড়লো। আগেও দেখেছি, কিন্তু মনোযোগ দেই নি এতে। এই বইটা তিনি উৎসর্গ করেছেন তাঁর শিশুপুত্র নিনিতকে। সেই উৎসর্গপত্রটা এখানে তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না। উৎসর্গপত্রটা এরকমঃ
আমার কেবলই মনে হচ্ছে পুত্র নিনিত পিতার কোনো স্মৃতি না নিয়েই বড় হবে। সে যেন আমাকে মনে রাখে এইজন্যে নানান কর্মকাণ্ড করছি। আমি ছবি তুলতে পছন্দ করি না। এখন সুযোগ পেলেই নিনিতকে কোলে নিয়ে ছবি তুলি। এই বইয়ের উৎসর্গপত্রও স্মৃতি মনে রাখা প্রকল্পের অংশ।
হুমায়ূন আহমেদ তাহলেও নিজেও আশংকা করেছিলেন যে, আর বেশিদিন টিকবেন না তিনি। তাই সত্যি হলো। মৃত্যুর আগেও তাঁর প্রবল রসবোধ কমে নি। নিউইয়র্ককে লোকজনকে দাওয়াত করে বলতেন যে, আমার চল্লিশা খেয়ে যান। মরার পরেতো পারবো না, তাই আগেই খাইয়ে দিচ্ছি আপনাদের।
মৃত্যুকে নিয়ে এমন প্রবল রসিকতা শুধু হুমায়ূন আহমেদই করতে পারেন। কুর্নিশ আপনাকে বাদশাহ নামদার।

Wednesday, November 11, 2015

ছয় কপির কবি

প্রায় সব ঔপন্যাসিক এবং কবিই নিজের লেখা উপন্যাস বা কবিতা নিয়ে আবেগে আপ্লুত থাকেন। মুখে বিনয়ের ভাব করলেও, মনে মনে ঠিকই ভাবেন যে, একটা কিছু কঠিন ফাটাফা্টি, একটা কিছু কালজয়ী জিনিস করে ফেলেছেন তিনি। এক কবি ভদ্রলোকও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি কিছু কবিতা লিখেছিলেন প্রথম যৌবনের চাপল্যে। সেটিকেই তিনি বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন। কারণ হিসাবে অবশ্য বন্ধুদের অনুরোধকে দেখিয়েছিলেন। নিজের সম্পর্কে এই কবির খুব উচ্চ ধারণা ছিলো। তিনি ভেবেছিলেন যে, নতুন ধরনের কবিতা লিখে বাংলা কাব্য রচনার রীতিকেই পাল্টে দেবেন। বইটার ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘সুকাব্যালোচক মাত্রেরই অত্র কবিতা দ্বয় পাঠে প্রতীতি জন্মিবেক যে, ইহা বঙ্গীয় কাব্য রচনা রীতি পরিবর্ত্তনের এক পরীক্ষা বলিলে বলা যায়।‘

তো এই রীতি পরিবর্তনের কবিতার বই বের হলো। নাম ‘ললিতা তথা মানস’। এতে আনন্দের বদলে হতাশাই বাড়লো কবির। পাঠক, সমালোচক কেউই এই কবিতার বইয়ের দিকে ফিরেও তাকালেন না। কবির যে সমস্ত বন্ধুরা তাঁকে গাছে ওঠার জন্য মই এনে দিয়েছিলো গভীর আগ্রহের সাথে, তারাও মই বগলদাবা করে চম্পট দিলো। বইটার সর্বসাকুল্যে বিক্রি হলো মাত্র ছয় কপি। বাংলা কাব্য রচনার রীতি পরিবর্তনের পরীক্ষা পরাজয় মেনে নিলো বিনা প্রতিবাদে। বহুকাল পরে এই কবি স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, ওই কাব্যগ্রন্থটির কোনো গুণই ছিলো না।

এই রকম ব্যর্থতা সাহিত্য জগতে বিরল নয়, বরং সুলভই বলা চলে। সাহিত্যের আকাশে তারা হতে গিয়ে বহু কবি যশোপ্রার্থীই হারিয়ে যান অন্তরীক্ষের অনন্ত আঁধারে। সেই রকম অসংখ্য কবি যশোপ্রার্থীর মতো তিনিও হারিয়েই যাচ্ছিলেন প্রায়। কবিতা রচনায় হারিয়েও গিয়েছিলেন। একটা মাত্র কবিতা আকস্মিকভাবে অমরত্ব লাভ করেছিলো শুধু এই কবির। কবিতায় না পারলেও, তিনি ফিরে এলেন সাহিত্যের অন্য অঙ্গনে প্রবল দাপটে । বাংলা সাহিত্যের নমস্য ব্যক্তি হলেন উপন্যাস রচনায়। শুধু উপন্যাসেই নয়, আরো অনেক শাখাতেও নিজস্ব শক্তিমত্তা দেখালেন তিনি। এই ভদ্রলোকের নাম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘আমার গদ্য সাহিত্য পাঠ' বইতে লিখেছেনঃ

“প্রথম কাব্যগ্রন্থের জন্য কোনোরকম সমাদর না পেয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বেশ কয়েক বছর আর কলম ধরেননি। তারপর ইংরেজি উপন্যাস লিখেও সুবিধে করতে পারলেন না, তাতেও নিরুদ্যম না হয়ে তিনি পরের বছরই বাংলায় লিখলেন আর একটি উপন্যাস। মাতৃভাষাই যে সাহিত্য রচনার প্রকৃষ্ট বাহন, সে উপলব্ধি তাঁর হয়েছিল খুব সম্ভবত তাঁর বিখ্যাত পূর্বসূরী মাইকেল মধুসূদন দত্তের দৃষ্টান্ত থেকে। প্রথমে ইংরেজিতে কাব্য লিখে মাইকেল মধুসূদনও অপাঠ্য রচনার বোঝা বাড়িয়েছিলেন, বাংলা লিখতে শুরু করে মাইকেল রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কিন্তু মাইকেলের চেয়ে বঙ্কিমের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল অনেক কঠিন। মাইকেল ইংরেজি কবিতার আঙ্গিক ধার করলেও তাঁর পিছনে ছিল বিশাল সংস্কৃত কাব্যের পটভূমিকা, বাংলাতেও কয়েক শতাব্দী ধরে উৎকৃষ্ট কাব্য সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বঙ্কিমের কাছে কোনো ভারতীয় গদ্যের আদর্শ ছিল না, বাংলা গদ্যও তখন নাবালক শিশুর মতন সদ্য দুর্বল পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে, সেই শিশুকে দিয়ে কোনো গভীর কথা বলানো যায় না।“

বঙ্কিম যে উপন্যাসটি লিখলেন, তার নাম দুর্গেশনন্দিনী। এই উপন্যাস লেখার পরে বঙ্কিম তাঁর দুই ভাইকে পড়তে দিয়েছিলেন। তাঁদের দুজনেই, যার মধে একজন পরবর্তীতে বিখ্যাত লেখক হয়েছিলেন, মন্তব্য করেছিলেন যে, বইটি ছাপানোর যোগ্য নয়। এই অবস্থায় হতাশ বঙ্কিম বাড়িতে অনেক পণ্ডিত লোক ডেকে এনে দুই দিন ধরে এই বই পাঠ করে শোনান। এঁরা অবশ্য ভাইদের মতো অমন নিষ্ঠুর ছিলেন না। উপন্যাস পাঠ শুনে মুগ্ধ হন তাঁরা এবং এটি ছাপাবার যোগ্য বলে রায় দেন। এঁদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে বঙ্কিম উপন্যাসটা কোনো পত্রিকায় না দিয়ে সরাসরি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। দুর্গেশনন্দিনী বই হিসাবে বের হয়ে আসে। দাম মাত্র এক টাকা।

এটা প্রকাশের সাথে সাথে পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বঙ্কিম এর পরেও আরো চৌদ্দটি উপন্যাস লিখেছেন, তার মধ্যে কোনো কোনোটা গুণে মানে এর চেয়েও ভালো। কিন্তু, এই উপন্যাসই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিলো। তাঁর জীবদ্দশাতেই এই বই বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে বারো হাজার কপি। ওই শতাব্দীতে আর কোনো বই এতো বিপুল পরিমাণে বিক্রি হয় নি।

আমরা হচ্ছি তিন কপি বই বিক্রির লেখক। এক কপি নিজে কিনি নিজের লেখার প্রতি প্রবল ভালবাসা এবং আপ্লুতা থেকে। এক কপি বউ কেনে, বইয়ের ভিতরে কী নিষিদ্ধ জিনিস আছে তা উদ্ধার করার জন্য। আর শেষ কপিটা গোপন প্রেমিকা কেনে অসহায় প্রেমিকের প্রতি মমত্ব দেখানোর জন্য। বঙ্কিমের এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা, তিন কপি বই বিক্রির লেখকেরা গভীরভাবে অনুপ্রেরণা পেতে পারি। আজকে হয়তো দুর্বল রচনা কেউ পাঠ করছে না, কেউ হয়তো কিনছে না বই পড়ার অযোগ্য বলে। কিন্তু বঙ্কিমের ওই ছয় কপি বই বিক্রির কথা মাথায় রাখলে, কোনো হতাশাই আর চেপে বসার সুযোগ পাবে না। 

হারেরেরেরে করে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়াতে বাধা নেই কোনো।

পাগলা সাহেব হিকি

কোলকাতায় ছিলেন এক পাগলা সাহেব। নাম তাঁর জেমস অগাস্টাস হিকি। একজন আইরিশম্যান তিনি। ভারতবর্ষে ইংরেজ আমলের একেবারে শুরুর দিকের ঘটনা এটি। 

এই পাগলা সাহেব, পাগলামি করতে করতে ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় কাজ করে গিয়েছিলেন। ভারত উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ইংরেজি পত্রিকাটা বের হয়ে এসেছিলো তাঁর হাত দিয়ে। শুধু ইংরেজি বলে নয়, এটিই ছিলো ভারতে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা। এর আগে অন্য কোনো ভাষায় পত্রিকা বের হয় নি গোটা ভারতবর্ষের কোথাও।

সালটা সতেরো শো আশি। শীতকাল। জানুয়ারি মাসের ঊনত্রিশ তারিখ। বের হয়ে এলো এক পত্রিকা। নাম বেঙ্গল গেজেট। কোলকাতার ইতিহাসের প্রথম পত্রিকা। ভারতের ইতিহাসেরও। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে যে, ইংল্যান্ডে লন্ডন টাইমস তখনও বের হয় নি। বের হয়েছিলো এর আরো আট বছর পরে। 

সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিলো এটি। প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত বের হতো কাগজটি। দুটি করে পাতা থাকতো। বারো বাই আট ইঞ্চি - এই ছিলো কাগজের আকার। দুই পৃষ্ঠাতেই ছাপা থাকতো তিন কলাম। হিকি সাহেবে পাগলা লোক হলেও ব্যবসা বুঝতেন খুব। খবর যতটা না থাকতো তার পত্রিকায়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকতো বিজ্ঞাপন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতে থাকা বৃটিশ সৈন্যদের মধ্যে পত্রিকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু ব্রিটিশদের মধ্যেই যে এটি জনপ্রিয় হয় তা নয়, ভারতীয়দেরকে বিশেষ করে কোলকাতার শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যেও এটি জনপ্রিয় হয়ে  অঠে। শুধু যে জনপ্রিয় হয় তাই নয়। এটি বাংলা ভাষায় পত্রিকা প্রকাশের জন্য দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে তাঁদেরকে। বেঙ্গল গেজেট পত্রিকাটি দুই বছর চালু ছিলো মাত্র। কী কারণে বন্ধ হলো, বলছি সেটা।



হিকি সাহেব ছাড়া এই পত্রিকায় আর কোনো সাংবাদিক ছিলো না। তিনিই এর সম্পাদক, তিনিই সাংবাদিক, তিনিই প্রকাশক। তিনি নিজে যে রকম খবর জোগাড় করতে পারতেন, সে রকম খবরই ছাপতেন। তবে, রসালো কেচ্ছার প্রতি তাঁর নজর ছিলো একটু বেশি পরিমাণে। আমাদের দেশের মানবজমিন পত্রিকা বা হালের অনলাইন পত্রিকা প্রিয় ডট কমের মতো। পাগলা হিকি লোকজনের নানা রকমের রসাল নামকরণ করে রসের হাট বসাতেন বেঙ্গল গেজেটে। কাউকে পরোয়া করতেন না তিনি। লাট সাহেবের প্রসঙ্গ থাকলেও, তা  বাদ যেতো না। ছাপা হতে বেঙ্গল গেজেটে। শুধু যে লাট সাহেবকে নিয়ে লিখতেন তা নয়, বাদ যেতো না লাট সাহেবের বউ-ও। বরং বলা যায় যে, লাট সাহেবের বউ লেডি হেস্টিংসের প্রতি তাঁর আক্রোশটা যেনো একটু বেশিই ছিলো। তাঁকে প্রেম নিবেদন করে কখনো ছ্যালা খেয়েছিলেন কি না কে জানে? লেডি হেস্টিংসকে নিয়ে নানা ধরনের রসালো কাহিনি ফাঁদতেন তিনি। এটাই ছিলো তাঁর সর্বোচ্চ সুখ।

পাগলা হিকির এই রকম পাগলামিতে অতিষ্ট হয়ে পড়েছিলো সাহেবরা। তাদের সব কেচ্ছা-কেলেংকারি ফাঁস করে দিচ্ছিলো হিকি। তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করছিলো প্রতিনিয়ত। ভয়ংকরভাবে আক্রমণ করছিলো একেকজনকে। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নিচ, কোনো কিছুর ভেদাভেদ ছিলো না হিকি সাহেবের কাছে। একেবারে সমানাধিকার এবং সমাজতন্ত্র কায়েম করেছিলেন তিনি আক্রমণের ক্ষেত্রে। কেউ বেশি, কেউ কম পাবে, তা হবে না। সুযোগ পেলেই তাদের দেহে বিষ ঢেলে দিতেন তিনি। ভিকির এই কাজে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিং মহা খাপ্পা ছিলেন হিকির উপরে। হিকি শুধু তাঁকে আক্রমণ করলে হয়তো এতোটা ক্ষেপতেন না তিনি, কিন্তু এই পাঁজি লোকটা তাঁর ঘরের বউকেও ছেড়ে কথা বলছে না। বাইরের লোকের সামনে এই রকম বেইজ্জতি হতে কেই বা চায়?

তো ওয়ারেন হেস্টিংস একদিন চটেমটে পাগলা হিকি সাহেবকে জেলের মধ্যে পুরে দিলেন। হিকি সাহেবও দিব্যি সুড়সুড় করে ঢুকে গেলেন কয়েদখানার ভিতরে। বগলে করে নিয়ে গেলেন তাঁর পোর্টেবল ছাপাখানাও। জেলখানা তাঁর জন্য নতুন কোনো জায়গা নয় যে ভয় পাবেন তিনি। দেশে থাকার সময়ে হিকি কাজ করতেন মুদ্রাকরের। ভারতে এসেছিলেন ভাগ্যান্বেষণে। ব্যবসা করে ভাগ্য ফেরাবেন, এটাই ছিলো তাঁর ইচ্ছা। ব্যবসা আরম্ভ করছিলেনও, কিন্তু ব্যবসা জমাতে পারেন নি তিনি। টাকা আয় করতে গিয়ে উলটো অনেক ধার দেনায় পড়ে গিয়েছিলেন। সে ধার আর শোধ দিতে পারেন নি। পাওনাদারেরা ছাড়বে  কেনো? মোকদ্দমা হয়েছিলো তাঁর বিরুদ্ধে। আদালতের রায়ে দুই বছরের মতো জেল খেটেছিলেন তিনি।

সেই পরিচিত এবং পুরোনো জায়গা্তেই আবার ফিরে এসেছেন তিনি। কাজেই, খুব একটা ভয়ডর বা বিকার নেই তাঁর। বরং এইবার পোর্টেবল ছাপাখানা আছে তাঁর সাথে। তাঁকে আর পায় কে? অস্ত্রসহ ঢুকেছেন তিনি কয়েদখানায়। এটা দিয়েই ঘায়েল করতে হবে সবাইকে। জেলে বসেই পত্রিকা চালু রাখলেন তিনি। বের হতে লাগলো বিষধর সব রিপোর্ট। এটাও মনে হয় বিশ্বরেকর্ড। জেলখানায় বসে পোর্টেবল ছাপাখান দিয়ে পত্রিকা চালু রেখেছেন কোনো সম্পাদক, এমন ইতিহাস পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

বিষ মাখানো তীরের মতো প্রতি সপ্তাহে জেলখানা থেকে বের  হয়ে আসছে পত্রিকা। হেস্টিংস দেখলেন যে, এতো মহা বিপদ। পাগলা তো জেলে বসেও সেই একই কাজ করে যাচ্ছে। থামানো দরকার তাঁকে। কাজেই, শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলেন হিকির কাছ থেকে তাঁর পোর্টেবল ছাপাখানাটাকেও কেড়ে নিতে।

পোর্টেবল ছাপাখানা হারিয়ে, হিকি সাহেবেরও সাংবাদিকতার ইতি ঘটলো।

Tuesday, November 10, 2015

বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়

১৯৮৭ সালে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছিলো এই বাংলাদেশে। এরকম কিছু এর আগে বাংলাদেশ দেখে নি।

এখন যে রকম কোনো আন্দোলন হলে, কিংবা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ হলে লোকে কপালে, কপোলে কিংবা শরীরে নানা জায়গায় শ্লোগান অথবা আলপনা এঁকে নিয়ে আসে, এরকমটা আগে ছিলো না। আগে আন্দোলন সংগ্রামে ব্যানার থাকতো, ফেস্টুন থাকতো, দেয়ালে চিকা মারা হতো, রাজপথেও হয়তো বা আলপনা আঁকা হতো, কিন্তু শরীরে কোনো কিছু লিখে প্রতিবাদ জানানো হতো না। এ বিষয়টা তখনও আবিষ্কৃত হয় নি।

বিরাশি সালে একদিন রাতের আঁধারে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নেই সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এরশাদ। তারপর এই লোক হেন কোনো অপকর্ম নেই যা করে নি বাংলাদেশে। গণতন্ত্র হয়ে পড়ে রুদ্ধ। মানুষ হারায় তাদের মৌলিক অধিকার স্বাধীনতা। স্বৈরাচার  এবং তার সাঙাতরা শুরু করে দেশকে পিছনে নিয়ে যাবার সকল কর্মকাণ্ড। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ। শুরু হয় আন্দোলন, সংগ্রাম আর আত্মাহুতি দেবার পালা।

সাতাশি সালের এই দিনে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালি গায়ে নেমে আসে এক পাগলা তরুণ। উদোম শরীরের বুকে এবং পিঠে লেখা ব্রহ্মাস্ত্র। স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, পল্টন, জিপিওতে বুকে পিঠে বাঁধা এই ভয়ংকর মারণাস্ত্র নিয়ে দাপিয়ে বেড়াতে থাকে সে ক্ষ্যাপার মতোন। শেখ হাসিনা পর্যন্ত ভয় পেয়ে যান এই তরুণের পাগলামিতে। কাছে ডেকে নিয়ে বলেন, "তোমার গায়ের লেখাগুলো ঢেকে ফেলো। এগুলোর জন্যই পুলিশ তোমাকে গুলি করবে।" দেবদূতের মতো অমলিন হাসি দিয়ে নূর হোসেন বলে, "আপা আপনি আমাকে দোয়া করুন, আমি গণতন্ত্র রক্ষায় আমার জীবন দিতে প্রস্তুত।" 

শেখ হাসিনার আশংকা মিথ্যা ছিলো না। এরকম জ্বলন্ত প্রতিবাদকে হজম করার শক্তি এরশাদ আর তার পেটোয়া বাহিনীর ছিলো না। জিপিও-র সামনে স্বৈরাচারের গদিরক্ষক পুলিশ গুলি চালায় নূর হোসেনের বুক লক্ষ্য করে। নূর হোসেনের বুক তো নয়, যেনো বাংলাদেশের হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যায় সেই ঘাতক বুলেট। 

গণতন্ত্র রক্ষার শপথ নিয়ে রাজপথে নামা আগুন চোখের অস্থির ক্ষ্যাপা ছেলেটা, স্বৈরাচারকে চ্যালেঞ্জ জানানো এলোমেলো চুলের দুঃসাহসী তরুণটা, কাটা কলা গাছের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় রাজপথে। 

যুগে যুগে নূর হোসেনরা এভাবেই গুলি খায়। গুলি খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। পড়ে গিয়ে আমাদের এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দেয়।

স্বার্থপর এই পৃথিবীতে পরার্থপরতার সুগন্ধময় সুবাস ছড়ায় বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন নূর হোসেনরা।



বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়

শামসুর রাহমান

সারারাত নূর হোসেনের চোখে এক ফোঁটা ঘুমও 
শিশিরের মতো জমেনি, বরং তার শিরায় শিরায় 
জ্বলেছে আতশবাজি সারারাত, কী এক
ভীষণ বিস্ফোরণ সারারাত জাগিয়ে রেখেছে 
ওকে, ওর বুকে ঘন ঘন হরিণের লাফ, 
কখনো অত্যন্ত ক্ষীপ্র জাগুয়ার তাকে 
প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে জ্বলজ্বলে 
চোখে খর তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে, 
এতটুকু ঘুমাতে দেয়নি। 

কাল রাত ঢাকা ছিল প্রেতের নগরী, 
সবাই ফিরেছে ঘরে সাত তাড়াতাড়ি। চতুর্দিকে 
নিস্তব্ধতা ওঁৎ পেতে থাকে, 
ছায়ার ভেতরে ছায়া, আতঙ্ক একটি 
কৃষ্ণাঙ্গ চাদরে মুড়ে দিয়েছে শহরটিকে আপাদমস্তক। 
মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক নৈঃশব্দ্যকে 
আরো বেশি তীব্র করে তোলে 
প্রহরে প্রহরে, নূর হোসেনের চোখে 
খোলা পথ ওর 
মোহন নগ্নতা দিয়ে আমন্ত্রণ জানায় দুর্বার। অন্ধকার 
ঘরে চোখ দুটি অগ্নিঘেরা 
জানালা, কব্জিতে তার দপদপ করে ভবিষ্যৎ। 

এমন সকাল তার জীবনে আসেনি কোনোদিন, 
মনে হয় ওর; জানালার কাছে পাখি 
এ-রকম সুর 
দেয়নি ঝরিয়ে এর আগে, ডালিমের 
গাছে পাতাগুলি আগে এমন সতেজ 
কখনো হয়নি মনে। জীবনানন্দের 
কবিতার মায়াবী আঙুল 
তার মনে বিলি কেটে দেয়। অপরূপ সূর্যোদয়, 
কেমন আলাদা, 
সবার অলক্ষে নূর হোসেনের প্রশস্ত ললাটে 
আঁকা হয়ে যায়, যেন সে নির্ভীক যোদ্ধা, যাচ্ছে রণাঙ্গনে। 

উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠে 
রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য শ্লোগান, 
বীরের মুদ্রায় হাঁটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ 
শহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা 
নূর হোসেনের বুক নয়, যেন বাংলাদেশের হৃদয় 
ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ 
বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার 
বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।

Sunday, November 8, 2015

জজ ব্যারিস্টারের লড়াই

বারুইপুরের আদালতে আজ ভিড়টা একটু বেশিই।
এরকম ছোট আদালতে এমন অসম্ভব ভিড় মোটেও মানানসই নয়। মামলাটাও এমন কোনো আলোচিত মামলা নয় যে অহেতুক ভিড় করতে হবে। আদালতের মতোই মামলাটাও ছোট। তবে মামলা ছোট হলেও বিবাদী ধনী লোক। কৌঁসুলি হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন সদ্য বিলাত ফেরত এক ব্যারিস্টারকে।
বারুইপুর কোলকাতার কাছে হলেও, সে সময়ে বিলাত ফেরত ব্যারিস্টার পথে ঘাটে দেখা যেতো না। বাঙালি ব্যারিস্টারতো ছিলই না বললেই চলে। তাই, বিলাত ফেরত ব্যারিস্টারকে ভিড় করে দেখার মানুষজনের এই লোভকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। তবে, আজকের এই ভিড় শুধু একজন বিলাত ফেরত ব্যারিস্টার দেখার কারণে নয়। এই বিলাত ফেরত ব্যারিস্টারটির নাম তারা তাঁর বিলাত যাবার আগে থেকে জানতো। বিলাতে যাবার আগে ব্যারিস্টারটি কয়েক বছর সাহিত্যচর্চা করে গেছেন। সে কারণে কেউ তাঁর কবিতা পড়েছে, কেউ কাব্যগ্রন্থ পড়েছে, কেউ বা রঙ্গ মঞ্চে তাঁর লেখা নাটক দেখেছে। কবি হিসাবে কিছুটা নামডাকও কামিয়ে ফেলেছেন তিনি এর মধ্যে। একজন আবেগপ্রবন কবি কীভাবে ব্যারিস্টারির মত আবেগশূন্য বৈষয়িক বিষয়কে সামাল দেন, সেটা দেখার কৌতুহলই মানুষজনের মধ্যে বেশি। এমন অদ্ভুত বৈপরিত্য সহজপ্রাপ্য নয়। সে কারণেই আদালত উপচে পড়ছে জনারণ্যে।
যথাসময়েই হাকিম সাহেব এজলাশে এলেন। অল্পবয়েসী একজন হাকিম। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। কোট পান্টের বদলে চোগা-চাপকান পরে আছেন তিনি। একহারা চেহারাগায়ে মাংস নেই বলে যতটুকু না লম্বা, তার চেয়ে বেশি লম্বা মনে হয়। মাথার মাঝখানে সিঁথি করা। হাকিম সাহেবের প্রশস্ত ললাট, খড়গের মত চাপা নাক। উপরের ঠোঁটটা নীচের ঠোঁটের চেয়ে বড়। নীচেরটা প্রায় দেখাই যায় না এমন। তারপরেও ঠোঁটের কোণায় একটা শুভ্র হাসির বিদ্যুৎ খেলা করে চলে। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল। এই উজ্জ্বল চোখ দেখলেই বোঝা যায় মানুষটা অসম্ভব রকমের বুদ্ধিমান একজন মানুষ।
জনতার মধ্যে যাঁরা একটু জ্ঞানী, একটু বেশি খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন যে, হাকিম সাহেব ব্যারিস্টার সাহেবের মত অত কীর্তিমান না হলেও তাঁর ঝাঁঝও কম নয়। এর মধ্যেই খান দুয়েক উপন্যাস লিখে ফেলেছেন তিনি। জনতার এই জ্ঞানী অংশটা তুমুল লড়াই আর নাটক দেখার জন্য মনে মনে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। কলোসিয়ামে বাঘ সিংহের লড়াই দেখে প্রাচীন রোমানরা যেমন উত্তেজিত হতো, অনেকটা সেরকম।
বিখ্যাত এবং সুদক্ষ অভিনেতা যেমন তুমুল আত্মপ্রত্যয় নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করেন, ব্যারিস্টার সাহেবও সেভাবেই এজলাশে হাজির হলেন। রাজকীয় ঢঙে, দাপুটে মেজাজে। পোশাক-আশাক, আচার আচরণে পুরোদস্তর সাহেবি তিনি। কেবল গায়ের রঙটিতেই বাঙালির শ্যামল কোমল ছাপ মাখানো। ব্যারিস্টার সাহেব হাকিম মশায়ের মত যুবক নন। মাঝবয়েসী, পৌঢ় তিনি। শরীরে পৌঢ়ত্বের স্থূলতা দেখা দিয়েছে। সিঁথি মাঝ বরাবর। মাথার চুল বিরল হতে শুরু করেছে। নাকটা মোটা, অধরগুলো পুরু। সারা চোখে মুখে ছটফটে চাপা উল্লাস তাঁর। মনের মধ্যে কী হচ্ছে তার পুরো ছাপ প্রকাশিত হয়ে যায় মুখের অভিব্যক্তিতে। কোনো কিছুই গোপন থাকে না সেখানে। চোখ দুটো সাগরের মতো উদার আর উজ্জ্বল। চারিপাশটা এক নজর বুলিয়েই তিনি বুঝে যান যে, এই রঙ্গ মঞ্চের প্রধান অভিনেতা তিনি। হাকিম জবরদস্ত হলেও তার সুতীব্র উজ্জ্বলতার কাছে ম্লান। প্রখর সূর্যের কাছে টিমটিমে মাটির প্রদীপ যেনো। এজলাশ, মামলা, হাকিম সবকিছু উপলক্ষ্য মাত্র, তিনিই একমাত্র লক্ষ্য, তিনিই প্রধান পুরষ। আকাশে একমাত্র নক্ষত্র তিনি, বাকি সবাই গ্রহ-উপগ্রহ, তাঁকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান। হাজার হাজার জনতার হাত থেকে অশ্রুত করতালি তিনি শুনতে পান। তাঁর নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে সমবেত সবাই।
হাকিম নিজেও টের পেয়েছেন যে, এই বিশালাকায় পর্বতের কাছে আজ তিনি ম্রিয়মান। সবার আগ্রহ এবং কৌতুহলের কেন্দ্র বিন্দু ব্যারিস্টার সাহেব। সমবেত সকলের মনোযোগ পাচ্ছেন বিলাত ফেরত ব্যারিস্টারটি। তিনি স্থির করলেন যে, মনোযোগ প্রত্যাশী আত্মম্ভরি এই ব্যারিস্টারকে আজ তিনি কোনো গুরুত্ব দেবেন না। পুরোপুরি উপেক্ষার নীতি নেবেন। এটাই হবে তাঁর শাস্তি। এই এজলাশে তিনিই প্রধান, আর সবাই গৌণ। ব্যারিস্টার সাহেবের বাইরে নাম যশ যাই থাকুক না কেনো, এখানে তাঁকে তাঁর অধীনতাই মেনে নিতে হবে। তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল দুটো চোখ কাগজে নিবদ্ধ রাখলেন তিনি। সরাসরি তাকাচ্ছেন না ব্যারিস্টারের দিকে। অনুকম্পা মিশ্রিত তাচ্ছিল্যের সাথে ব্যারিস্টারের তর্ক শুনতে লাগলেন তিনি।
ব্যারিস্টার সাহেবের জন্য সব জায়গাই রঙ্গমঞ্চ। আর সেই মঞ্চের তিনিই সেরা অভিনেতা। শুধুমাত্র দর্শকেরাই নয়, সহ অভিনেতারাও তাঁর দক্ষ অভিনয়ের দর্শকমাত্র। এই ছোকড়া হাকিমও তাই। অহংকারী শার্দুলের মত তিনি গভীর আত্মবিশ্বাস আর আত্মপ্রত্যয় নিয়ে কেন্দ্রভূমি দখল করে ফেলেন। কৌঁসুলির কৌশল তাঁর কর্ম নয়, বরং নিজেকে মেলে ধরার মধ্যেই মূল আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে। সে কারণে দুই চার কথার পরেই তাঁর মক্কেল চলে যায় পশ্চাদভূমিতে। তিনি নিজে চলে আসেন সম্মুখভাগে। দর্শক মনোরঞ্জনই এখন তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। আদালত কক্ষ জুড়ে রাজকীয় পদক্ষেপে হেঁটে বেড়ান তিনি। গমগমে মোটা স্বরে এক নাগাড়ে কথা বলে যেতে থাকেন। সেই বক্তব্যে কখনো থাকে ইংরেজি কাব্যের কোটেশন, কখনো থাকে ভারতচন্দ্রের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গোক্তি, শ্লেষ। বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে কখনো তাকান জনতার দিকে, কখনো তাকান হাকিমের দিকে, কখনো আত্মপ্রেমী নার্সিসাসের মতো নিজের অত্যুগ্র বিলাতি পোশাকের দিকে।
ব্যারিস্টারের মনোযোগ আকর্ষণের এই তীব্র নাটকীয় প্রচেষ্টা দেখে মনে মনে হাসেন হাকিম। পুরোটা সময় ধরে নির্লিপ্ত তাচ্ছিল্য তিনি ধরে রেখেছেন। আত্মপ্রেমী, উদ্ধত, অহংকারী, দুর্বিনীত ব্যারিস্টারকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে হাজারো চেষ্টা করলেও তাঁর মনোযোগ তিনি পাবেন না। সন্তুষ্টির একটা আনন্দ খেলা করে যায় তাঁর মনের মধ্যে। অধর কোণে ফুটে উঠে চাপা কৌতুকের হাসি। বুঝতে পারছেন ব্যারিস্টার সাহেবের চোখ তাঁর দিকে, প্রাণপনে চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁর মনোযোগ পাবার।
হঠাৎ করেই ভুলক্রমে কাগজ থেকে চোখ উঠে যায় তাঁর। ব্যারিস্টারের সাথে চোখাচোখি হয়। এতক্ষণের সংকল্প ভুলে, আদালত ভুলে, জনতা ভুলে, স্থানকালপাত্র ভুলে দুজনে দুজনের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। সময় যেনো থেমে গেছে কোথাও, ইতিহাসের চাকাও বোধ হয় সেই সাথে। কোলাহলমূখর জনতাও আশ্চর্যজনকভাবে স্তব্ধ। ইতিহাসের এক বিরল ঘটনার সাক্ষী তারা আজ।
তীক্ষ্ণ উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত একজোড়া চোখ মিলে গেছে সাগরের মত উদার আত্মপ্রত্যয়ী আবেগী চোখের সাথে, কাব্যের সাথে গদ্যের সম্মিলন ঘটেছে যেনো।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাংলা ভাষার প্রথম আধুনিক কবি এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা কাব্য প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্তের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকেন অনন্তকাল।

কালের যাত্রা রূদ্ধ হয়ে যায় ঠিক সেই মুহূর্তটায়।

Friday, November 6, 2015

হজ্জ, হিজাব এবং হারিয়ে ফেলা একটি সেকুলার রাষ্ট্র

রাশেদ খান মেনন হজ্জে যাচ্ছেন শুধু তিনি একাই নন, হাসানুল হক ইনুও হজ্জে যাচ্ছেন দুজনেই আবার তাঁদের স্ত্রীদেরকেও সঙ্গে নিচ্ছেন। এই পূ্ণ্য কাজে স্ত্রীরা বাদ থাকবেন, তাতো হয় না। বামপন্থীরা আজীবন বামপন্থী থাকেন নাকেউ কেউ মজা করে বলে যে, মানুষ বামপন্থী থাকে ওই তারুণ্যের সময়টাতেই, যখন বাপের হোটেলেই খাওয়া-দাওয়া চলে এই সময় চাওয়া-পাওয়ার কিছু থাকে না সংসারধর্ম শুরু করলেই বামপন্থা সুবিধাবাদীসর্বস্ব ডানপন্থার দিকে বাঁক নিতে শুরু করে একারণেই দেখা যায় ছাত্রজীবনে যারা শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়, পুঁজিপতিদের মুণ্ডুপাত করে, তারাই ছাত্রজীবন শেষে বেছে নেয় এনজিওর বিলাসবহুল চাকুরি রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনু, দুজনেই সুবিধাপন্থার পথে হাঁটছেন বহুদিন ধরেই এ নিয়ে খুব একটা বিস্মিত নই আমি আমার বিস্ময় ওই হজ্জে যাওয়া নিয়ে
এঁরা দুজনেই এখন পর্যন্ত দুটি বাম সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতা অর্থাৎ অফিসিয়ালি তাঁরা বামপন্থাকে ত্যাগ করেন নিবামপন্থীরা যে একেবারেই ধর্ম-কর্ম করেন না, বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন না, এমন নয় আমাদের দেশে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনেকক্ষেত্রেই সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে মিশে গেছে বা নিজেই সামাজিক রূপ ধারণ করেছে ধার্মিক না হয়েও বাধ্য হয়ে এ সমস্তগুলোতে বামপন্থী বা নাস্তিকদের অংশ নিতে হয় সামাজিক চাপে পড়ে এর মধ্যে পড়ে মিলাদ, কুলখানি, ইদ, জুম্মার নামাজ, এই সব
কিন্তু, হজ্জ ঠিক এই মাপের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় এটি একটি উঁচুমার্গের বিশুদ্ধ ধর্মীয় রিচুয়াল গভীরভাবে বিশ্বাসী ব্যক্তির পক্ষেই শুধুমাত্র হজ্জে যাওয়া সম্ভব অনেকে অবশ্য রাজনৈতিক কারণেও হজ্জে যায় আমাদের সমাজে ভোটের রাজনীতিতে হজ্জফেরত রাজনীতিবিদের আলাদা কদর আছে বলেই হয় তো হজ্জযাত্রা করে থাকেন তাঁরা তবে, এটা ঠিক যে, যাঁরা হজ্জে যান, তাঁরা মূলত বিশ্বাসী কেউ হয়তো ধর্মচর্চা একটু কম করেন, কেউ হয়তো একটু বেশি করেনকিন্তু, চুড়ান্ত সত্যি হচ্ছে যে, তাঁরা সকলেই ধর্মবিশাসে প্রবলভাবে বিশ্বাসীই রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনু ধর্মের এই রাজনীতি না করেও সংসদ সদস্য হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন হজ্জে না গেলে এই অবস্থান সহসাই ক্ষুণ্ণ হবে, এমনও নয়
তাহলে, কেনো তাঁদের এই হজ্জযাত্রা? বাংলাদেশ কি আসলেই একটা ধর্মভিত্তির রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গিয়েছে? রাষ্ট্রের কর্ণধার থেকে শুরু করে একেবারে হীন দরিদ্র নাগরিককেও এখন ধর্মের আফিমে বুদ হতে হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজ যে প্রগতিশীল একটা অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে ধর্মাশ্রয়ী অবস্থানে সরে যাচ্ছে, সেটা গত কয়েক দশক ধরে যাঁরা বাংলাদেশকে লক্ষ্য করছেন, তাঁরা সবাই জানেন
বাংলাদেশে এখন ধর্মকর্মচর্চা প্রবল এর ছাপ পড়েছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে আগে ঢাকার রাস্তায় বয়ষ্ক কিছু নারী আর খুব ধর্মীয় পরিবেশ থেকে উঠে আসা মেয়েরাই শুধু বোরকা পরতো আর এখন ঘরে ঘরে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, প্রগতিশীল-প্রতিক্রিয়াশীল নির্বিশেষে নারীরা হিজাব পরছে স্কুল-কলেজের বাচ্চা মেয়েগুলোও নিস্তার পায় নি এই পর্দা-পুশিদার হাত থেকে মাত্র দুই দশক আগেও এই রীতি ছিলো না এখন জেএসসি বলুন, এসএসসি বলুন, কিংবা এইচএসসি বলুন, মেয়েদের ছবি যখন পত্রিকায় ছাপা হয়, তখন দেখি বিপুলসংখ্যক মেয়ে হিজাব পরে দাঁড়িয়ে আছে পোশাক যার যার ব্যক্তিগত পছন্দ। এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছি না আমি। কিন্তু, পোশাক দিয়ে একজন মানুষের মন-মানসিকতা অনেকখানি বুঝে ফেলা সম্ভব।
আগে হজ্জে যেতো মূলত বয়ষ্ক লোকেরা এখন ছেলে-বুড়ো সবার মধ্যেই হজ্জে যাবার হিড়িক চেপেছে সমাজ নিত্যদিন বদলায়, এতে অবাক হবার কিছু নেই কিন্তু আমাদের বদলে যাওয়াটা এতোটাই দ্রুত এবং অপ্রত্যাশিত যে, এটি হয়ে পড়েছে রীতিমত বিস্ময়কর এবং ব্যাখ্যাতীত
পাকিস্তানের ধর্মাশ্রয়ী প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারে ঢাকা মধ্যযুগীয় পথের বিপরীতে বাঙালি বেছে নিয়েছিলো প্রগতিশীলতা এবং আধুনিকতার এক উজ্জ্বল পথ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রকে বাতিল ঘোষণা করে বাঙালি প্রাণ দিয়েছিলো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে বাঙালি যে প্রগতিশীলতা, যে মুক্তমনসমৃদ্ধ আচরণ, যে অসাম্প্রদায়িকতা, যে আধুনিকতা দেখিয়েছিলো, সেই মানের ধারে কাছে যাবার মতো যোগ্যতা এখন আর তার নেই
পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিলো ধর্মের ভিত্তিতে মজার বিষয় হচ্ছে যে, পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানের অবদানই ছিলো সবচেয়ে বেশি এই রাষ্ট্র গঠনের পরে বাঙালি মুসলমানদের আরো বেশি পরিমাণে গোঁড়া মুসলমান হবার কথাকিন্তু, বিস্ময়করভাবে স্বাভাবিকতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে বাঙালি মুসলমান হেঁটেছিলো অস্বাভাবিক পথে, একেবারে উল্টোরথের যাত্রা ধর্মীয় পরিচয় ঝেড়ে ফেলে ধর্মনিরপেক্ষ আবরন গায়ে জড়ানোর জন্য প্রবল ইচ্ছুক হয়ে উঠেছিলো সেবাঙালি মুসলমানের চিন্তা এবং মননে আধুনিকতা এসে ভর করেছিলো মায়াবী যাঁদু নিয়ে বাঙালি মুসলমানের এই জাগরণ নজর এড়ায় নি অনেকেরই, নজর এড়ায় নি প্রতিবেশী দেশের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদেরও
১৯৬০ সালে নহণ্যতে খ্যাত সাহিত্যিক মৈত্রেয়ী দেবীর সম্পাদনায় কোলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় পূর্বপাকিস্তানের প্রবন্ধ সংগ্রহ এর প্রকাশক ছিলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ এতে স্থান পেয়েছিলো মুহাম্মদ আবদুল হাই, বদরুদ্দীন উমর, আবুল ফজল, আহমদ শরীফ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কাজঈ মোতাহার হসেন, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহদের মতো বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের লেখা এই সংকলনের দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয় ১৯৬৪ সালে এতে ভূমিকা লিখেছিলেন দুজন মৈত্রেয়ী দেবী নিজে এবং অন্নদাশঙ্কর রায়
ভারত ভাগ হয়েছিলো ধর্মের ভিত্তিতে ধর্মীয় উন্মাদনাই ছিলো পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনের মূল উপাদান এই উন্মাদনায় বাঙালি মুসলমান ক্ষণিকের উত্তেজনায় অংশ নিয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু খুব অল্প দিনের মধ্যেই তার নিজের ঠিকানা খুঁজে নিতে ভুল করে নি যতই ধর্মের তাওয়ায় দুই পক্ষকে একসাথে ভাজা হোক না কেনো, বাঙালি মুসলমান ঠিকই টের পেয়ে গিয়েছিলো যে জাতিতে সে পশ্চিম পাকিস্তানিদের চেয়ে আলাদা পশ্চিম পাকিস্তানের রুক্ষ্ণ-কঠিন পাথুরে ভূমি তার অন্তরে কোনো আবেদন সৃষ্টি করে না, বরং বাংলা জল, মাটি, জলাভূমিই তাকে টেনেছে আকুল করে অন্নদাশংকর লিখেছেন,
ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতির মোহ যদিও কারো কারো মন জুড়ে রয়েছে তবু তার সেই একছত্র দাপট আর নেই দেশভিত্তিক ভাষাভিত্তিক লোকভিত্তিক সংস্কৃতির দিকেও সাধারণের দৃষ্টি পড়েছে পূর্ব পাকিস্তানের সব চেয়ে জনপ্রিয় পালার নাম রূপবান রেকর্ডে ও ফিল্মে ওর সমকক্ষ নেই অথচ ওর কথাবস্তু আরব পারস্য থেকে আসেনি, আসেনি উর্দু থেকে ওটা মুঘল দরবারেরও কিসসা নয় আমাদেরই চিরপরিচিত মালঞ্চমালা শুনলুম ঠাকুমার ঝুলির সব কটা কাহিনীই রূপান্তরিত হয়ে গেছে রেডিও পাকিস্তানেও আমরা এন্তার লোকগীতি শুনতে পাই সবই পূব বাংলার মাটির ফসল
এই যে পূর্ব বাংলার মানুষের নিজের মাটির প্রতি, নিজের ঐতিহ্যের প্রতি, নিজের শিঁকড়ের প্রতি, নিজের ভাষার প্রতি, নিজের সংস্কৃতি প্রতি অফুরন্ত টান, এই টানই তাদের চিন্তাধারায় চেতনাগত পরিবর্তন এনে দিচ্ছে ব্যাপকগতভাবে এই পরিবর্তন এমনই ভিন্ন মাত্রার এবং গুণগতভাবে পার্থক্যসূচক যে অন্নদাশঙ্কর একে তুলনা করছেন রেঁনেসাসের সাথেতিনি বলেন,
পূর্ব পাকিস্তানে এই যে ব্যাপারটা চলেছে এটাও একপ্রকার রেনেসাঁস এর থেকেই আসবে একপ্রকার রেফরমেশন ইসলামের তথা ইসলামী শাস্ত্রাদির পুনর্মূল্যায়ন ওই স্টেজটা এখনো আসেনি, তবে এর ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে কোরান শরিফের তর্জমা দিয়ে যেমন জার্মানীতে হয়েছিল বাইবেলের অনুবাদ দিয়ে পবিত্র ভাষা আরবী সন্মন্ধে মোহভঙ্গ হয়েছে বাংলার উপর টান এখন তার চেয়েও বেশী লোকে বাংলার জন্য জান দিতে পেরেছে ও পারে আরবীর জন্যে একটি মানুষও মৃত্যুবরণ করবে না
পাকিস্তান সৃষ্টির সময়ে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বাংলা দুটো ভিন্ন ধর্মের লোক বাস করতো এই ভূখণ্ডে এদের মধ্যে সবসময় যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দের সম্পর্ক বিরাজ করেছে, এমন নয় কিন্তু, দুই সম্প্রদায় সন্দেহ, অবিশ্বাস, দ্বিধা-সংকোচ নিয়েও পাশাপাশি থেকে গিয়েছে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা ছাড়াই দেশ বিভাগের সময়ে প্রথম বাংলার হিন্দু এবং মুসলিম অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে গেলো পরষ্পরের মুখোমুখি দাঙ্গা হচ্ছে, একের হাতে রক্ত ঝরছে অন্যের যেনো একই বাঙালি জাতি নয়, একই মাটির সন্তান নয়, দুটো পরষ্পর ঘৃণাকারী জাতিগোষ্ঠী মুখোমুখি হয়েছে একে অন্যকে নিপাত করার উদ্দেশ্যে পূর্ব বাংলায় মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার সুবাদে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় এক তরফা বিজয়ী হয়েছে মুসলমানেরা পরাজিত হিন্দুরা দলে দলে দেশ ত্যাগ করেছে
এই ঘটনাগুলো হৃদয়বিদারক নিঃসন্দেহে কিন্তু, এগুলোর মাত্রা যতখানি না ভয়াবহ ছিলো, লোকমুখে সেগুলো ছড়িয়েছে আরো বেশি ভয়াবহরূপে পুর্ব বাংলা মানে মুসলিম দানবদের বসবাস, ছুরি-তলোয়ার হাতেই তাদের ঘোরাফেরা, হিন্দু পেলেই গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা করে, হিন্দু মেয়েদের দেখলেই ধর্ষণে উন্মত্ত হয়, এমন একটা ধারণা গ্রথিত হয়ে যায় পশ্চিম বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলমানদের সবাই যে বিকারগ্রস্থ নয়, সেখানেও যে মানবিক মানুষ আছে, আছে গোঁড়ামিমুক্ত প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক মানুষজন, সেটিকে বিবেচনায় নেবার মতো অবকাশ তাদের ছিলো নাতবে, এর মধ্যেও কেউ কেউ ব্যতিক্রম ছিলেন ঠিকই পাখির চোখে দেখেছে পুর্ব অঞ্চলের উন্নত চিন্তার ধরনকে এঁদের মধ্যে মৈত্রেয়ী দেবী একজন অন্ধকার অঞ্চল বলে যেটাকে এতদিন জেনে এসেছেন, সেখান থেকে তীব্র উজ্জ্বল আলোরচ্ছটা বিচ্ছুরিত দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি তাঁর সেই বিস্ময়কেই তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন এভাবে
১৯৪৪ সালে যখন কলকাতার দাঙ্গা বাঁধে তখন এদিকের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও গাল গল্প গুজবে পাকিস্তানের যে চিত্র ফুটে উঠেছিল তা ভয়াবহ যেন সমস্ত পূর্বপাকিস্তান একটি দানব অধ্যুষিত দেশ ও সেখানে ইতর ভদ্র সকল ব্যক্তি ছুরি হাতে কাফেরেরজীবন নাশের আগ্রহে ও নারী ধর্ষণের পৈশাচিক উল্লাসে প্রমত্ত যেন সেখানে, কোনো হিন্দুর প্রাণ নিরাপদ নয় নিরাপদ নয় কোনো নারী এবং ধর্মীয় গোঁড়ামীর শৃঙ্খলে ধর্মরাষ্ট্রের সকল নাগরিক আষ্টে পৃষ্ঠে বাঁধা
সেই সময়ে আমরা সাম্প্রদায়িক বুদ্ধির যে প্রমত্ততা এই বাঙলা দেশের শিক্ষিত লোকদের মধ্যে দেখেছিলাম তাতে স্তম্ভিত হয়েছিলাম যে দেশে এত ঘটা করে রবীন্দ্রজয়ন্তী হয়, সেই দেশেও যদি সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এমন ভাবে বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করতে পারে, তবে তার বিপদ কতখানি তা সহসা উপলব্ধি করলাম সেই সময় থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদনামে একটি প্রতিষ্ঠানে আমরা সমচিন্তা সম্পন্ন কয়েকজন একত্র হয়েছি নানাভাবে সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিকে পরিষ্কার করার কাজে নেমে সহসা পূর্ব পাকিস্তানের পত্র পত্রিকা হাতে পেয়ে সেদিন অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলনেরসংবাদ সামান্য সামান্য এদেশের পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও তার যথার্থ রূপটি এবং তার ভিতরের অর্থটি আমার কাছে এবং আমার মত বহু ভারতীয় বাঙালীর কাছেই অজ্ঞাত ছিল যদিও তখন পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদ পত্র কলকাতায় নিয়মিত আসত, তবু দুচারজন ছাড়া হিন্দু বাঙালীর কাছে এবং বেশিরভাগ এদিকের মুসলমান বাঙালীর কাছেও তা অজ্ঞাত ছিল এদেশের পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও তার যথার্থ রূপটি এবং তার ভিতরের অর্থটি আমার কাছে এবং আমার মত বহু ভারতীয় বাঙালীর কাছেই অজ্ঞাত ছিল যদিও তখন পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদ পত্র কলকাতায় নিয়মিত আসত, তবু দুচার জন ছাড়া হিন্দু বাঙালীর কাছে এবং বেশীর ভাগ এদিকের মুসলমান বাঙালীর কাছেও তা অজ্ঞাত ছিল এদেশের পত্র পত্রিকায় আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী সম্বন্ধে বড় বড় প্রবন্ধ লেখা হছে কিন্তু পূর্ব বাঙ্গলার নবজাগরণের সমস্ত সংবাদ ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত একেবারেই অনুচ্চারিত ছিল গোপন করা হয়েছিলই বলব, কারণ যাঁরা সংবাদ সরবরাহ ও সংগ্রহ করেন তাঁরা জানতেন না একথা বিশ্বাস হয় না পূর্ব বঙ্গের অগ্রসর সমাজের চিন্তার বিবর্তন অবশ্যই ওয়াকিবহাল মহলে জানা ছিল কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক সেটা এদেশের অধিকাংশ লোকের মনে বিশবছর আগের পাকিস্তান আন্দোলনের চিত্রটিই স্থির ছিল এবং পাকিস্তান সরকার ও তার জনগণের মধ্যে যে পার্থক্য ক্রমেই প্রসারিত হয়ে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গী বিপরীতমুখী হচ্ছে সে সত্য একেবারেই আবৃতি ছিল কাশ্মীরে হজরতবালের মসজিদ থেকে হজরতের চুলটি খোয়া গিয়েছে এই গুজব ছড়ানো ও কোনো স্বার্থন্বেষী মুসলিম মন্ত্রী খুলনাতে মিল মজুরদের উস্কানী দেওয়ার ফলে সেখানে দাঙ্গা ঘটে ও দলে দলে ভীত আর্ত মানুষ ভারতে আসতে থাকে সেই সময়ে বদলা নেবার উৎসাহে ৮/৯/১০/১১ জানুয়ারীতে কলকাতায় আগুন জ্বলছিল তখন হঠাৎ পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদপত্রের ভূমিকা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম কি উদার নির্ভীক কণ্ঠে সমস্ত বাঙালী মুসলমান শুভবুদ্ধির আহবান জানিয়েছিলেন জানিয়েছিলেন ধিক্কার সরকারী নিস্ক্রিয়তাকে
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে, প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারার মানস প্রতিভূ হচ্ছে পাকিস্তান কিন্তু, এর জন্মের পরপরই বাঙালি মুসলমানের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে বাঁচার জন্য রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের নিয়ে এসেছে তারা ধর্মভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দুর্গন্ধময় গোবরে এ যেনো সুগন্ধময়, অপরূপ সুশ্রী ফুটন্ত এক পদ্মফুল ধর্মরাষ্ট্রের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার এই চরম উৎকর্ষ দেখে হতভম্ব হয়েছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী তাঁর এই উচ্ছ্বাসকে, নব আবিষ্কারকে নিজের মধ্যে দমিয়ে রাখেন নি তিনি বরং দামামা বাজিয়ে জানানোর চেষ্টা করেছেন সকলকে তিনি লিখেছেন,
সেই দাঙ্গার সময় পূর্বপাকিস্তানের বাঙালী সমাজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল যে আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটতে পারবে না এবং তার সূত্রপাত হলে দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে লড়তে হবে এরই ফলে কলকাতার দাঙ্গার বদলা হিসাবে নারাণগঞ্জে আদমজীমিলে যে দাঙ্গা সুরু হয় তা দুদিনে বন্ধ হয়ে গেল ও রূঢ়কেল্লার ভীষণ দাঙ্গার কোনো বদলা পাকিস্তানে হতে পারল নাজনসাধারণের এই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংকল্পবদ্ধ অভিযান সম্ভব হয়েছে সেখানকার লেখক সাহিত্যিক সংবাদপত্র পত্রিকার দ্ব্যর্থহীন নিন্দাবাণী গুণ্ডাবাজ স্বধর্মীদের প্রতি ক্রমাগত ঘোষিত হয়েছে বলেই
ধর্মরাষ্ট্রের মধ্যে কখন ধীরে ধীরে সেকুলার চরিত্র গড়ে উঠল এ দেশে বসে আমরা তার কিছুই সংবাদ রাখিনি-লজ্জার ও বেদনার সঙ্গে এই সত্যর মুখোমুখী হবার পরই নবজাতকপত্রিকা প্রকাশ করে আজ ছয় বছর হল ক্রমাগত পূর্বপাকিস্তানের লেখকদের রচনা প্রকাশ করে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করেছি
পাকিস্তান ছিলো ধর্মরাষ্ট্র সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধে তারা ঢোকানোর চেষ্টা করেছে ধর্মের বিষবাষ্প এর বিপরীতে বাঙালি স্বপ্ন দেখেছে এক সেকুলার রাষ্ট্রের, অসাম্প্রদায়িক এক সমাজের পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই বাঙালি এবং পাকিস্তানিদের পথ গিয়েছে সম্পূর্ণ দুইদিকে বেঁকে বাঙালি তার স্বপ্নপূরণে নেমেছে আন্দোলনে, ঝরিয়েছে বুকের রক্ততারপর অর্জন করেছে সেকুলার এক দেশ কিন্তু, তারপর? তারপরই ঘটেছে সবচেয়ে হতাশাজনক ঘটনাটি একটি সেকুলার রাষ্ট্রকে, সমাজকে বাঙালি অকস্মাৎ পরিণত করে ফেলেছে এক ধর্মরাষ্ট্রে শুরুতে একে ধরা হয়েছিলো বিচ্ছিন্ন এক ঘটনা হিসাবে, অযাচিত এক দুর্ঘটনা হিসাবে কিন্তু পরে দেখা গিয়েছে যে, আসলে তা ছিলো না কোনো দুর্ঘটনা, কিংবা আকস্মিক কোনো ঘটনা স্বাধীন রাষ্ট্রে বাঙালি সেকুলারিজম চায় নি, হেঁটেছে ধর্মরাষ্ট্রের পথে তার চলনে, বলনে, আচার-আচরণে ফুটে উঠেছে তার মুসলিম মানসিকতা

আর, এই মানসিকতার সাথেই তাল মিলাতে গিয়ে আপোষ করেছেন রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনু হাজার হোক রাজনীতিবিদ তারা জনগণকে নিয়েই তাঁদের কায়কারবার জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য তাঁদের কাছে অনেকজনগণের ইচ্ছার বৃষ্টি যে দিকে হবে, রাজনীতিবিদেরা তাঁদের ছাতাও সেদিকেই খুলে ধরবেন, এটাই স্বাভাবিক সেই স্বাভাবিক কাজটাই করেছেন তাঁরা সময়ের প্রয়োজনে