Wednesday, November 4, 2015

ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং সরকারের দায়

পূর্নেন্দু পত্রীর জনপ্রিয় কাব্য 'কথোপকথন' এর নায়িকা নন্দিনী ক্রমাগত বন্ধুদের মৃত্যু সংবাদ শুনতে শুনতে বিমর্ষ হয়ে তার প্রেমিক শুভংকরকে বলেছিলো যে, 'লোকাল ট্রেনের মত বেশ ঘন ঘন মৃত্যু আসছে যাচ্ছে আজকাল' নন্দিনীর বলা সেই কথার মতো করে ঘন ঘন করে মৃত্যু নেমে আসছে আজ বাংলাদেশে

জন্ম নিলে, মৃত্যু হবে একদিন এটাই প্রকৃতির নিয়ম কিন্তু, বাংলাদেশে এই মৃত্যুর মিছিল প্রাকৃতিকভাবে আসছে না আসছে একদল উন্মত্ত, বিকৃতরুচির, বীভৎসপ্রিয়, রক্ত-পিপাসু ধর্মান্ধদের হাত ধরে তাদের চাপাতির এলোপাতাড়ি কোপে মুক্ত চিন্তার মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে দূরের সমুদ্রে একে একে আকাশের তারাগুলো আলোহারা হয়ে নিভে যাচ্ছে একে একে অকালে

এই তো মাত্র সেদিন অভিজিৎ গেলো, তারপর একে একে গেলো বাবু, অনন্ত, নীল এদের যাবার মিছিল শেষ না হতেই দীপন গেলো এখানেই শেষ নয়, আসছে দিনগুলোতে আরো যাবে আরো অসংখ্য রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত, শোকাতুর বিদায় দেখতে হবে আমাদের আরো অসংখ্য প্রিয় মানুষ হারিয়ে যাবে কুয়াশার আড়ালে, আরো অসংখ্য সৃষ্টিশীল সজীব মানুষ নিমেষেই পরিণত হবে নির্জীব লাশে মৃত্যু উপত্যকা আজ আমার দেশ বাতাসে মৃত্যুর ভয়াল ফিসফিসানি, আঁধার ঘেরা আকাশে উড়ছে অসংখ্য শকুন, জনারণ্যে নির্ভয়ে ঘুরছে একদল হিংস্র হায়েনা, তাদের সম্মিলিত অট্টহাসিতে প্রকম্পিত বাংলাদেশের স্থবির হৃৎপিণ্ড

গত আটমাসে বাংলাদেশে চাপাতির আঘাতে মারা গিয়েছে পাঁচজন, গুরুতরভাবে আহত হয়েছে চারজন এটি একটি বিস্ময়কর এবং গভীর বেদনার বিষয় প্রতিটা হত্যাকাণ্ডের পরেই সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন, মানবিক মানুষেরা নানাভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন কেউ এর জন্য রাস্তায় নেমেছেন, কেউ কলম হাতে তুলে নিয়েছেন শক্ত করে, অসির বিরুদ্ধে মসির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে নেমেছেন কলম দিয়ে, কেউ বা থানা-পুলিশ, আদালতে ছুটোছুটি করেছেন এর সমাধানের জন্য এগুলোই হচ্ছে সুসভ্য প্রতিবাদের ভাষা

যে নৃশংসতা আজ বাংলাদেশে ঘটছে, তাকে বন্ধ করার জন্য এগুলোই যথেষ্ট হওয়া উচিত ছিলো কিন্তু, হয় নি আমাদের দুর্ভাগ্য, এই প্রতিবাদগুলোকে যথেষ্ট বলে মনে হয় নি রাষ্ট্রের কাছে উন্নাসিক এক উদাসিনতা প্রদর্শন করে গিয়েছে সরকারের হর্তাকর্তা ব্যক্তিরা, আইন শৃঙখলায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গরা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটা, এবং সেগুলোর ব্যর্থ প্রতিবাদ জানাতে জানাতে যখন সবাই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, বিমর্ষ এবং বিতশ্রদ্ধ, ঠিক তখনি সবচেয়ে সঠিক এবং সময়ের সেরা প্রতিবাদটি জানিয়েছেন একজন শোকাহত পিতা

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিনের বেলায়, আজিজ মার্কেটের মতো কর্মব্যস্ত এবং জনবহুল এলাকায়, প্রকাশনী সংস্থার অফিসে ঢুকে, জোর করে চেপে ধরে জবাই করা হয়েছে এর স্বত্ত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে ব্যক্তিগতভাবে দীপন কোনো অন্যায় করেন নি সজ্জন মানুষ ছিলেন তিনি তাঁর একমাত্র অপরাধ তিনি অভিজিৎ রায়ের লিখিত বই 'বিশ্বাসের ভাইরাস' প্রকাশ করেছিলেন

বই প্রকাশ করার 'অপরাধ' করে হত্যার শিকার হবার ঘটনা এই উপমহাদেশে এটি দ্বিতীয় বাংলাদেশে নজীর এই প্রথমবারের মতোন উপমহাদেশে প্রথম হত্যার শিকার হয়েছিলেন রাজপাল মালহোত্রা নামের একজন প্রকাশক সেটা সেই ঊনিশ ' পয়ত্রিশ সালে 'রঙ্গিলা রাসুল' নামের একটা বই প্রকাশ করেছিলেন তিনি অপরাধে তাঁকে ছুরি মেরে হত্যা করেছিলো ইলমুদ্দিন নামের এক তরুণ ধর্মান্ধ জঙ্গি বাংলাদেশে ছুরির বদলে চাপাতি ব্যবহৃত হয়েছে, এই যা পার্থক্য

দীপনের হত্যার পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে তাঁরা বাবা জানান যে, এই হত্যার বিচার তিনি চান না কারণ, এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক এদেশে সুবিচার বলে কিছু নেই নিয়ম রক্ষার জন্য ছেলের হত্যার জন্য মামলা হয়তো তিনি করবেন, কিন্তু কারো কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা তাঁর নেই অভিনব এই প্রতিবাদটিই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যে  বর্বর কর্মকাণ্ড ঘটছে তার বিরুদ্ধে সেরা প্রতিবাদ

দীপনের বাবার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের প্রথম দিককার শিকার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদও বন্যা নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলেন জানে বেঁচে গেছেন তিনি গুরুতরভাবে আহত হবার পরেও তিনিও এই সরকারের কাছে অভিজিৎ হত্যার বিচার চান না বলে জানিয়েছেন তবে, অধ্যাপক হক যেখানে বিচার না হবার সংস্কৃতির কারণে বিচার চাইতে অনিচ্ছুক, সেখানে বন্যা আহমেদ আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে এই সব হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারের দিকেই আঙুল তুলেছেন ফলে, এদেরই কাছে বিচার চাইতে তাঁর তীব্র অনীহা তিনি লিখেছেন, ‘এই সরকারের কাছ থেকেও কিছু চাওয়ার নেই আমাদের, একটাই অনুরোধ ওনাদের কাছে, দয়া করে দিনরাত আরআমরা সেক্যুলার পার্টি বলে গলা ফাটিয়ে নিজেদের এনার্জি নষ্ট করবেন না আপনারা আপনাদের লক্ষ্য পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চুপ করেই থাকুন; অভিজিৎ, অনন্ত, রাজিব, নিলয়, বাবু, দীপনরা আপনাদের জন্য একেকটা স্কোর কার্ড আপনারা বুক ফুলিয়ে বলে যান যে সবইরাজনৈতিক খেলা সবইপারসেপশান মৌলবাদীদের চাপাতিতে নিশ্চুপভাবে তেল দিয়ে যান, না হলে আপনাদের ভোট কমে যেতে পারে আপনারা খুব ভালো করে জানেন যে আপনাদের মৌনতাই ওদের অস্ত্রে শান দিতে সহায়তা করে যাচ্ছে হয়তো আমরা দিনের বেলায় ভুল করে একে নিশ্চুপতা ভাবি কে জানে, রাতের অন্ধকারে আপনারা হয়তো মুখর হয়ে ওঠেন, ভোট ভাগাভাগি করে নেওয়ার খেলায় যোগ দেন তাদের সাথে'

আমি অবশ্য এই বিচার চাওয়ার বিষয়টা ঠিক বুঝি না কোনো একটা দেশে অপরাধ সংগঠিত হলে বা কেউ আহত হলে বা খুন হলে, এটি সরকারেরই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে তার প্রতিকারের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার, সেই অপরাধের সাথেও সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করে তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা এর জন্য বিচার চাওয়া বা বিচার দাবি করার কিছু নেই বিচার চাইতে হলে বা দাবি করতে হলেই বুঝতে হবে যে সেই দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত রয়েছে বাংলাদেশে যে ঘন ঘন বিচার চাওয়া হয় বা বিচার দাবি করা হয়, তা এই আইনের শাসনের অনুপস্থিতির জন্যই করা হয়

বন্যা আহমেদ হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারের দিকে যে অঙুলি তুলেছেন, তার সত্যতা এই মুহুর্তে যাচাই করাটা অত্যন্ত দুরূহ একটা কাজ এই বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রমাণের জন্য আমাদের হয়তো অপেক্ষায় থাকতে হবে অনেকগুলো দিন, অনেকগুলো মাস, বা অনেকগুলো বছর হত্যাকাণ্ডে সরকারের কোনো একটা অংশের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হলেও, এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে সরকারের দায়কে অস্বীকার করা যায় না কিছুতেই সেই শুরু থেকেই সরকার এক ধরনের নির্লিপ্ততা দেখিয়েছে এতে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে তাঁরা চরমভাবে, কিংবা বুঝলেও, সেটাকে থামানোর কোনো ইচ্ছা বা আগ্রহ তাঁদের ছিলো না

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও এখন পর্যন্ত বুঝতে অক্ষম হচ্ছেন যে, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি মহা পরিকল্পনার অংশ হিসাবে এই সব হত্যাকাণ্ড একের পর এক সংঘটিত হচ্ছে এই পাঁচ খুনেই সমাপ্তি ঘটবে না এই হত্যা উৎসবের, এই মহাযজ্ঞের আগামী এক মাস বা দুই মাসের মধ্যেই ঘটবে আরো একটি হত্যাকাণ্ড, তারপর আবার প্রায় সমান ব্যবধান রেখে বা তারও আগে রক্ত এবং জীবন ঝরবে অন্য কোনো তরুণ বা যুবকের কিংবা তরুণী অথবা যুবতীর

যাঁরা খুন হচ্ছেন, তাঁদের গায়ে নাস্তিকতার ছাপ মারা দেখেই হয়তো সরকারী দলের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব, এই মৌনতা, এই পিছনে হটে যাবার প্রানান্তকর প্রচেষ্টা এদের সমর্থনে কথা বলতে গেলে গায়ে নাস্তিকতার ট্যাগ লেগে যেতে পারে, ফলশ্রুতিতে ধর্মীয় ভোটের জায়গাতে ভাটা লাগতে পারে, এই হিসাব হয়তো ক্ষমতাসীনদেরকে ভীত করে রেখেছে আমরা দেখেছি, যখন রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হলো তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ হিসাবে অভিহিত করেছিলেন কিন্তু, এর পরই সেই অবস্থান অত্যন্ত থেকে দ্রুতগতিতে সরে আসে সরকারী দল

প্রধানমন্ত্রী তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় রয়টার্সকে বলেন যে, “আমরা (আওয়ামী লীগ) নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না তবে এতে আমাদের মূল আদর্শের কোনো বিচ্যুতি হবে না আমরা ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী যদিও সজীব ওয়াজেদ জয় আওয়ামী লীগের কোনো গুরুত্বপুর্ণ পদে বহাল নেই, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসাবে তিনি বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করে থাকেন তাঁর বক্তব্যই যে আওয়ামী লীগের সরকারী ভাষ্য, তাতে কোনো সন্দেহ থাকার কারণ নেই

এক সময়কার ধর্ম নিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের এই গা বাঁচানোর প্রচেষ্টাই খুব সম্ভবত সবকিছুকে এতোখানি খারাপ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে জঙ্গিরা জয়ের এই বক্তব্যে ভয় পাবার বদলে উৎসাহিত হয়েছে অধ্যাপক জাফর ইকবাল যেমন বলেছেন, “হত্যাকাণ্ডকে স্পর্শকাতর বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যে স্টেইটমেন্ট দিয়েছেন, তা মৌলবাদীদের জন্য একটা গ্রিন সিগনালমনে হচ্ছে, তোমরা (জঙ্গিরা) এভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাও, সরকার কিছুই করবে না একজন একজন করে মারা হবে, সরকার কোনো কথা বলবে না

পুলিশ আসামী ধরার ক্ষেত্রে কিংবা এই হত্যাকাণ্ডের যে শিকড়, সেই শিকড় উপড়ে ফেলতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে গত আট মাসে ছয় ছয়টা আক্রমণ হয়েছে একই কায়দা একই ধরনের মানুষের উপরে বাংলাদেশের পুলিশ বা গোয়েন্দা বিভাগ এর কোনো হদিস করতে পারছে না, এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয় হ্যাঁ, এটা সত্যি যে বাংলাদেশের পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলি উন্নত বিশ্বের মতো সুপ্রশিক্ষিত নয় বা তাদের লজিস্টিক সাপোর্টও সুউন্নত নয় কিন্তু, বাংলাদেশের এই সংস্থাগুলোর এরকমও দৈন্যদশা নয় যে, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ধারাবাহিকভাবে এতোগুলো হত্যাকাণ্ড হলেও, এর কোনো সুরাহা তারা করতে পারবে না তাহলে, বিষয়টা কি এমন যে, তারাও সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার জন্যই অপেক্ষমান? সরকারের কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছামূলক সিদ্ধান্ত নেই বলেই এই নিমীলিত নয়ন, এই নিঝুম নীরবতা, এই নিষ্করুণ নিষ্ক্রিয়তা?

শুধু নিষ্ক্রিয় থাকলেও কথা ছিলো ধর্মান্ধদের চাপাতির বদলে অনেকেই হাতে তুলে নিয়েছিলো কলম এবং কিবোর্ড এই দুই অস্ত্র ব্যবহার করে জঙ্গিদের সাথে লড়াইয়ে নামতে চেয়েছিলেন অনেকেই কিন্তু সেই তাদেরকেও থামিয়ে দিয়েছে সরকার আইসিটি এক্ট সাতান্ন করে এই ধারা অনুযায়ী ধর্ম নিয়ে  সামান্যতম সমালোচনা করলেই, যে কাউকেই ধরে নিয়ে যেতে পারে পুলিশ জঙ্গি মোল্লা এবং নাস্তিকদের লড়াইয়ে এমনিতে নাস্তিকরা কোণঠাসা, সেই কোণঠাসাকে অবস্থানকে এই ধারার এবং এর তড়িৎ প্রয়োগের মাধ্যমে আরো দুর্বল করে দিলো বা বলা চলে ধ্বংস করে দিলো

একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং তার সুরাহা না হবার জন্য সরকারকেই সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে  সরকারেরই দায়িত্ব তার সকল নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের যে বিশাল জনগোষ্ঠী, সেই জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দেওয়া আক্ষরিক অর্থেই সম্ভব নয় সেই অসম্ভব জিনিস কেউই আমরা আশাও করছি না কিন্তু, সদিচ্ছাটা দেখার খুব ইচ্ছা আমাদের সকলেরই সরকারের এই দায়মুক্তি ঠিক তখনই ঘটবে যখন আমরা দেখতে পাবো যে, তারা আন্তরিকতা এবং সততা নিয়ে এগিয়ে আসছে সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে সমস্যার সমাধান না করতে পারলে ঘোর দুর্দিন অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য


অভিজিৎ, অনন্ত, বাবু, নীলয়, দীপনদের লম্বা লাইন আরো লম্বা হবে, মৃত্যু আসবে লোকাল ট্রেনের মতো স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ঘন ঘন, তারপর হারিয়ে যাবে এক গাদা শব নিয়ে দূরের কোনো সমুদ্রে একটা প্রগতিশীল প্রজন্মকে চাপাতির আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে তাদের কণ্ঠনালীকে চেপে ধরার কদর্য এই খেলার দায়দায়িত্ব আওয়ামী লীগকেই বইতে হবে আকণ্ঠ, আগামী দিনে, অনাগত সময়ে

Thursday, October 1, 2015

এই দিন দিন নয়

রোগা পটকা মুস্তাফিজকে কনুই মারার অপরাধে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক এমএস ধোনির ম্যাচ ফির পচাত্তর ভাগ অংশ জরিমানা করা হয়েছে। সেই সাথে ধোনির যাত্রাপথের সামনে এসে কনুই এর গুঁতো খাবার অপরাধে বাংলাদেশের সদ্য অভিষিক্ত পেসার মুস্তাফিজেরও ম্যাচ ফির পঞ্চাশ শতাংশ কেটে নিয়েছে আইসিসি।
আইসিসির এই বিচার দেখে গ্রাম্য সালিশের কথা মনে হলো আমার। গ্রামে মাতব্বরের ছেলে কাজের মেয়েকে ধর্ষণ করে হাতে নাতে ধরা পড়ে গেলে, তার বিচার না করে উপায় থাকে না। নইলে জনরোষের কবলে পড়তে হতে পারে। এই আশংকায় বিচার হয় বটে, তবে যতো দূর সম্ভব কম শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাকে। শুধু যে কম শাস্তি দেওয়া হয় তা নয়, বরং তারপর তার অপরাধকে লঘু করার জন্য কাজের মেয়ের অপরাধেরও খতিয়ান নেওয়া হয়। মাতব্বরের ছেলে ঘরে একা আছে জেনেও সে কেনো ওই ঘর ঝাড়ু দিতে গেল? নিশ্চয় মনে তার নষ্টামি ছিলো ভরা। এই অপরাধে তাকেও শাস্তি দেওয়া হোক। চুল কেটে, গালে মুখে চুনকালি মেখে, পিঠে দুই ঘা লাগিয়ে দিয়ে ভাগিয়ে দেওয়া হোক এই নষ্টা মেয়েকে গ্রাম থেকে।
বাচ্চা একটা ছেলে সবে মাত্র তার প্রথম ম্যাচে নেমেছে। তাও যেই সেই ম্যাচ নয়। দুই দুইবারে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ভারতের বিপক্ষে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অন্যায়ভাবে বাংলাদেশকে হারানোর কারণে এটি পরিণত হয়েছিলো এক হাই ভোল্টেজ ম্যাচে। এখানে তার মতো নবীন খেলোয়াড়ের এরকম উত্তেজনার ম্যাচে ভুলচুক করাটাই স্বাভাবিক। সেটাই করেছে সে। ভুলক্রমে ব্যাটসম্যানের লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভুল মুস্তাফিজ যে ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম করেছে, তা নয়। অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ও খেলার উত্তেজনায় এমন ভুল অতীতে বহুবার করেছে। কিন্তু, বহু খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ক্যাপ্টেন কুল যে কাজটি করেছেন, সেটি রীতিমতো গর্হিত একটা কাজ। তিনি খুব সযত্নে কাছে এসে অত্যন্ত সচেতনভাবে মুস্তাফিজকে কনুই দিয়ে গুঁতিয়ে আহত করে মাঠছাড়া করেছেন। অনিচ্ছাকৃত ধাক্কায় মুস্তাফিজ মাঠে পড়ে গেলেও কোনো আপত্তি ছিলো না। কিন্ত, সেরকম কিছু এখানে ঘটে নি। মারটা ছিলো ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত। খেলায় না পারার হতাশা থেকে উদ্ভূত গভীর রাগ, হিংসা এবং দ্বেষের ফসল এটি। তা না হলে মুস্তাফিজ যখন তাঁর পেশীবহুল পেটানো শরীরের মার খেয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে, উদ্বিগ্ন ধোনির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতো ছুটে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া, স্যরি বলা। ধোনি এর কোনোটাই করেন নি, বরং মুস্তাফিজের বিরুদ্ধে নালিশ করাতেই ব্যস্ত ছিলেন তখন তিনি। ভদ্রলোকের খেলা বলে পরিচিত ক্রিকেট যে আর ভদ্রলোকের খেলা নেই, এটা থেকেই তা বোঝা যায়।
মাঠের দুই আম্পায়ার এবং ম্যাচ রেফারি পুরো ঘটনার জন্য দায়ি করেছিলেন ধোনিকে। ক্রিকিনফোর রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, শুরুতে শুধুমাত্র ধোনিকেই শাস্তি দিয়েছিলেন ম্যাচ রেফারি এন্ডি পাইক্রফট। তখনই ভারত তাদের শক্তি দেখানোর ইচ্ছার কথা জানিয়ে দেয়। আইসিসিতে ভারত মোড়লিপনা করছে অনেক বছর ধরেই। তাদের ঘাটানোর সাহস কারোরই নেই। ফলে, ভারসাম্য বজায় রাখতে মার খাওয়া মুস্তাফিজকেও ধরে এনে শাস্তি দিয়ে ধোনির বর্বর আচরণকে হালকা করে দেওয়া হয়েছে।
ভারত- বাংলাদেশের প্রথম খেলার পর থেকে ক্রিকইনফো এবং ডন পত্রিকার কমেন্ট সেকশন ফলো করছি। বেশিরভাগ ভারতীয় দেখলাম এই ঘটনায় ধোনির কোনো দোষ দেখতে পাচ্ছে না, তাদের কাছে সব দোষ মুস্তাফিজের। সেই পথ আগলেছে ধোনির। তার যাতে আঘাত না লাগে সেই জন্য ধোনি তাকে মোলায়েম করে, আদরের ছোঁয়া দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। মানুষ কতোখানি অন্ধ হতে পারে, সেটা এদের আচরণ দেখলে বোঝা যায়। আগে আমার ধারণা ছিলো যে, শুধুমাত্র পাকিস্তানি সমর্থকইরাই অন্ধ হয়। এবার টের পেলাম এ বিষয়ে ভারতীয়রাও কম যায় না। এই অন্ধত্ব থেকে তাঁদের উচ্চশিক্ষিত ধারাভাষ্যকারী কিংবা সেলিব্রিটি প্রাক্তন খেলোয়াড়রাও মুক্ত নয়। ধোনি যা করেছে, সেটি হচ্ছে শারীরিক আক্রমণ। মুস্তাফিজ যতো বড়ো অপরাধই করুক না কেনো, ধোনির কোনো অধিকার নেই মাঠে তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার। এটি যে কোনো পরিস্থিতিতেই মারাত্মক অপরাধ বলে গণ্য। তিনি মাঠেই মুস্তাফিজের বিরুদ্ধে আম্পায়ারদের কাছে নালিশ করতে পারতেন, মাশরাফিকে ডেকে বিষয়টা জানাতে পারতেন, মুস্তাফিজকে ডেকে বুঝিয়ে দিতে পারতেন, কিংবা ম্যাচ শেষে অফিসিয়ালি নালিশ জানাতে পারতেন ম্যাচ রেফারির কাছে। কিন্তু, সেগুলো কিছু না করেই অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে বাচ্চা ছেলেটাকে আঘাত করেছেন তিনি। সেই আঘাত পেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা মাঠের বাইরে শুশ্রুষা নিতে হয়েছে মুস্তাফিজকে।
পুরোনো একটা প্রবাদ আছে যে, তোমার খুব রাগ হলে বৃদ্ধ একজন লোককে লাথি মারতে পারো। কারণ, তুমি জানো সে কী। কিন্তু, একজন বাচ্চাকে কখনো ভুলক্রমেও মেরো না, কারণ তুমি জানো না সে একদিন কী হবে। মুস্তাফিজের ওই রোগা পটকা শরীরে কী অমিত শক্তি, কী অসীম সম্ভাবনা, আর কী বিপুল পরিমাণ তেজ লুকিয়ে আছে, সেটা ধারণাই করতে পারেন নি ধোনি। বারো ওভার পরে মাঠে ফিরে এসে মুস্তাফিজ তার উপরে করা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়েছে বিপুল বিক্রমে। না, শারীরিকভাবে আক্রমণ করে নয়, কিংবা গালিগালাজ করেও নয়। বোলিংটাকে ধারালো ছুরি বানিয়ে বিশ্বের সেরা ব্যাটিং লাইন আপকে কুচি কুচি করে কেটেছে সে। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, “যে মুস্তাফিজকে ধোনি ধাক্কা দিয়ে মাঠের বাইরে যেতে বাধ্য করেছিলো, সেই মুস্তাফিজই ফিরে এসে ভারতকে ধাক্কা দিয়ে ম্যাচ থেকে বের করে দিয়েছে।
আমাদের ছোট ভেবে দিনের পর দিন যারা অন্যায় করে যাচ্ছে, অবহেলা আর অপমান করে যাচ্ছে, তার সব মনে রাখছি আমরা। চিরদিন ছোট থাকবো না আমরা। একদিন না একদিন বড়ো হবোই। সেইদিন কড়ায় গণ্ডায় সব কিছুর হিসাব বুঝিয়ে দেবো আমরা। সেই বোঝাতে গিয়ে খেলায় জেতার জন্য তিন আম্পায়ারকে বশ করবো না আমরা, আইসিসিকে পকেটে পুরবো না, মাঠে পেশী ফুলিয়ে গুঁতোগুঁতি করবো না। তার বদলে যা করবো তা হচ্ছে সতেরো বছরের তেজী কিশোর তামিম ইকবালকে ছেড়ে দেবো। মুনাফ প্যাটেলের বুলিং এর বিরুদ্ধে যে আগুন চোখ নিয়ে ফিরে তাকাবে, তারপর ফার্স্ট বোলিং এর বিরুদ্ধে ড্যান্সিং ডাউন দ্যা উইকেট করে মাঝ পিচে এসে বলকে পিটিয়ে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেবে। সবুজ চোখের কমান্ডো সাব্বিরকে ছেড়ে দেবো। কব্জির মোচড়ে বলকে অনায়াসে মাঠের বাইরে ফেলে দেবে সে। অমিত সাহসের নাসিরকে ছেড়ে দেবো, বোলার বল করার আগেই স্টান্স বদলে ফেলবে যে নিমেষেই। ছেড়ে দেবো সৌম্যকান্তি সৌম্যকে। বাউন্সারের বিরুদ্ধে ব্যাট উঁচু করে যে দাঁড়িয়ে থাকবে অবিচল। যে মুহুর্তে বল মাথায় আঘাত আনবে বলে মনে হবে, ঠিক তখনি সোনালি সৌন্দর্য নিয়ে ব্যাটের আলতো ছোঁয়ায় বলকে পাঠিয়ে দেবে দড়ির ওপাশে। ছেড়ে দেবো রোগা পাতলা মুস্তাফিজকে, যার সুইং সাপের মতো ছোবল দেবে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটের কানায়। ছেড়ে দেবো হারকিউলিসের মতো শক্তিমান এবং হিরণ্ময় সৌন্দর্যের তাসকিনকে। যে প্রতিটা বিজয়ের পরে আকাশে উড়ে চেস্ট বাম্প করবে মাশরাফির সাথে। তার সাথে সাথে আকাশে উড়বে ষোল কোটি বাঙালিও।
বড়ো হবার শুরুটা সবে শুরু হয়েছে মাত্র। সামনে পড়ে আছে অনাগত সম্ভাবনার দিন, উজ্জ্বল সূর্যের সোনালি রোদের সময়। সব বর্বরের মাথাই একদিন ঘুরিয়ে দেবো আমরা।

এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে।

Friday, May 15, 2015

অনন্ত এক আক্ষেপের নাম অনন্ত

পৃথিবীর এই প্রান্তে যখন রাতের খাবার শেষে বিছানায় যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রায় সবাই, ঠিক সেই সময়টাতে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের এক শ্যামল ভূমিতে, নিজের জান বাঁচানোর জন্য বনপোড়া হরিণীর মতো ঘাস মাড়িয়ে প্রাণপনে ছুটে চলেছে এক আহত, আতংকিত এবং রক্তাক্ত যুবক। তাকে ধাওয়া করে আসছে মৃতুর মতো কালো পোশাক পরা চার যমদূত। শুধু পোশাকই কালো নয় তাদের, কালো কাপড়ে ঢাকা তাদের মুখ, খোলা চোখে কুৎসিত জিঘাংসা। হাতে ঝিলিক দিচ্ছে রক্তমাখা চাপাতি। এ রক্ত পলায়নপর যুবকেরই দেহ থেকে নিঃসৃত। প্রথম সাক্ষাতেই পলায়নপর এই যুবকের গায়ে নির্দয়ভাবে চাপাতি চালিয়েছিলো যমদূত যুবকেরা। আহত যুবক পঞ্চাশ, ষাট গজ ছুটেই থমকে দাঁড়ায়। সামনে পুকুর। সাঁতার জানে না সে। পানিকে তার আজন্ম ভয়। এই ভয় পিছনে ধাবমান মৃত্যুদূতদের চেয়েও বেশি। পানির মধ্যে ঝাঁপ দেবার চেয়ে নিজেকে এদের হাতেই তুলে দেওয়াটাই শ্রেয় ভেবে নেয় সে। উপায়হীনতার কাছে পরাস্ত হয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ করে সে। ঘাতকদের ধারালো চাপাতি অতি নির্মমভাবে একের পর হামলে পড়ে তার নধর দেহে। হাঁটু ভাঁজ করে ঘাসের উপর পড়ে যেতে যেতে যুবকের একবার হয়তো মনে পড়ে যায় প্রিয় দাদার কথা। তার মতোই চাপাতির আঘাত নিয়ে তিনিও চলে গেছেন এই ভূবন ছেড়ে। সামান্য সময়ের ব্যবধানে একই দৃশ্যের যেনো পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে তার দাদা আর তার জীবনে।
যে ভয় এবং আতংক, যে দুঃশ্চিন্তা এবন দুঃস্বপ্ন তাকে প্রতিনিয়ত জাগিয়ে রাখতো রাত্রিবেলায়, আজ তার সবকিছুই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। বিকারহীন এক অসহায় প্রতিবাদহীনতায় সে মেনে তার এই নিষ্ঠুর এবং অনিবার্য নিয়তিকে। ভুল সময়ে, ভুল মানুষদের মাঝে জন্মানোটা শুধু অপরাধই নয়, বিশাল এক পাপও বটে।সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেই সে আজ অকালে বিদায় নিচ্ছে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে, তার প্রিয় মাতৃভূমি থেকে, তার প্রিয়তম কমলালেবুর সুবাসমাখা আদিভূমি থেকে। এই বিদায়ে অনন্ত আক্ষেপ আছে, আছে অনন্ত জিজ্ঞাসা, নেই শুধু অন্তিম সময়ের করুণ আর্তনাদ এবং অস্ফুট বিলাপ।
মাত্র আড়াই মাস আগে যখন বইমেলা থেকে ফেরার পথে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে জনারণ্যে নৃশংসভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা এবং জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক ও যুক্তিবাদী মানুষ অভিজিৎ রায়কে, তখনই শোকের সাথে সাথে অনন্তের শিড়দাঁড়া দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত নেমে গিয়েছিলো। শুধু অনন্তের একারই নয়, এই অনুভূতি হয়েছিলো সকল বাংলাদেশি যুক্তিবাদী লেখকেরই। এর পর মাত্র এক মাসের মাথায় যখন দিনে দুপুরে অসংখ্য মানুষের সামনে চাপাতি দিয়ে কোপানো হলো, হত্যা করা হলো ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে, তখন সেই ভয় রূপান্তরিত হলো প্রবল আতংকে। সেই আতংকে কেউ কেউ লেখা ছেড়ে দিয়েছে, কেউ কেউ ছদ্মনামের আড়ালে চলে গেছে, আবার কেউ বা প্রবল ঔদাসিন্যে অনিয়মিত হয়ে গেছে লেখালেখির জগতে।
অনন্তও এর ব্যতিক্রম কেউ না। অভিজিৎ রায় এবং ওয়াশিকুর রহমান বাবুর হত্যা পরবর্তী আতংকে আক্রান্ত হয়েছিলো সেও। জানতো, সে নিজেও নিরাপদ নেই এই ঘূর্ণিময় অশান্ত সময়ে। সে কারণে নিজেকে যতোখানি পারা যায় গুটিয়ে এনেছিলো সে। এক প্রকার পলাতক জীবনই যাপন করছিলো সে। কিন্তু, এই জীবনতো কোনো মানুষের নয়। প্রতি মুহুর্তে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ভয় আর আতংক নিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যায় না। কাজেই, অনন্তও স্বাভাবিকভাবেই চেষ্টা করছিলো যত দ্রুত সম্ভব বিদেশে চলে আসার জন্য। এতে করে প্রাণপ্রিয় দেশ হারাবে সে, হারাবে প্রাণের প্রিয় বাবা-মা, ভাই-বোনকে, তারপরেও তো অন্তত স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস নিতে পারবে, পারবে মুক্ত বাতাসে মুক্তভাবে বেঁচে থাকতে। এই ভাবনা থেকেই বাইরে চলে আসার জন্য জোর চেষ্টা নিয়েছিলো সে। নানা জায়গায় লেখালেখি করেছে এর জন্য। নানা লোককে বলেছে সুপারিশপত্র লিখে দিতে। এর মধ্যেও আমিও একজন।
অনন্তর হয়ে মুক্তমনার মডারেটর হিসাবে ইন্টারন্যাশনাল হিউমানিস্ট এন্ড এথিক্যাল ইউনিয়নের (IHEU) ডিরেক্টর অব কম্যুনিকেশনস বব চার্চিলকে একটা সুপারিশনামা লিখেছিলাম আমি। সেখানে উল্লেখ করেছিলাম যে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সে বাংলাদেশে থাকা অত্যন্ত অনিরাপদ বোধ করছে এবং নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে নানা গোপন স্থানে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আইএইচইইউ যেনো তার জন্য কিছু করে, যাতে সে দেশ ছেড়ে পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপদ এলাকায় চলে আসতে পারে। আইএইচইইউ আমাকে আশ্বস্ত করেছিলো এই বলে যে, তারা তাদের সাধ্যের মধ্যে যতোটুকু আছে, ততোটুকু তারা করবে। আমার এই সুপারিশপত্রের কথা জানতে পেরে দারুণ খুশি হয়েছিলো অনন্ত। আমাকে একটা ব্যক্তিগত মেইলে লিখেছিলো, “ফরিদ ভাই, বব চার্চিলকে মেইলটি পাঠানোর জন্য আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো বুঝতে পারছি না। জানি না, আমার আবেদন IHEU এক্সেপ্ট করবে কিনা আদৌ, কারণ এখানে খুবই সীমিত সংখ্যক কোটা রয়েছে আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেই সহস্রাধিক আবেদন জমা পড়ে IHEU-এর কাছে। তথাপি চেষ্টা করছি। এখন দেখা যাক কী হয়।
এই দেখা যাক এর চুড়ান্ত পরিণতি এখন কী হয়েছে, তাতো আমরা সকলে দেখতে পাচ্ছিচেষ্টা, অপেক্ষা সবকিছুর অনেক উর্ধ্বে সে এখন চলে গিয়েছে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে।
অথচ, এই ছেলেটাই কী অসীম সম্ভাবনা নিয়েই না শুরু করেছিলো। মুক্তমনার একেবারে প্রথম দিকের লেখক সে। মাত্র ঊনিশ-বিশ বছরের বাচ্চা একটা ছেলে সে তখন। বয়সে বাচ্চা হলেও লেখালেখিতে বিন্দুমাত্র তার ছাপ ছিলো না কোনো। খুবই পরিণত এবং খুবই গুরুগম্ভীর তথ্যবহুল লেখা লিখতো সে। এধরনের লেখা লিখবার জন্য অনেক ধৈর্য, পরিণত মস্তিষ্ক আর প্রচুর পরিমানে পড়াশোনার প্রয়োজন। এতো অল্প বয়সে এগুলো সে কীভাবে অর্জন করেছিলো, সেটা এক বিস্ময়ই ছিলো আমাদের জন্য।
শুধু লেখালেখি নয়, একই সময়ে সে যুক্তিবাদ প্রসারের জন্য মাঠেও নেমে পড়ে সে। নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে অন্যতম একটা কাজ ছিলো যুক্তিনামের ষান্মাসিক একটা অসাধারণ মানের প্রগতিশীল পত্রিকা বের করা। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলো সে। যুক্তিযাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন কীরকম অসাধারণ মানের একটা পত্রিকা ছিলো সেটি। সমস্ত ধরনের অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলো যুক্তি। অনন্ত-র এই সমস্ত যুক্তিবাদী কর্মকাণ্ড এবং মুক্ত-চিন্তাকে সমাজের সর্বস্তরে সরিয়ে দেবার প্রচেষ্টাকে সম্মান জানানোর জন্য ২০০৫ সালে মুক্তমনা তাকে র‍্যাশনালিস্ট পুরস্কার দেয়।
এরকম একজন মেধাবী যুবককে, যার দেশকে, সমাজকে দিয়ে যাবার কথা ছিলো অসংখ্য কিছু, কয়জন ঘাতকের চাপাতির আঘাত নিয়ে বিদায় নিতে হলো অকালে। অনন্ত শুধু একা নয়, একের পর এক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের সেরা মানুষগুলোকে বিদায় করছে মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠী। অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, মৃত্যুর মিছিল ক্রমশ বাড়ছেই।
বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে, সেটা এবং বাংলাদেশ সরকারের এইসব হত্যাকাণ্ডকে তেমনভাবে গুরুত্ব না দেবার প্রবণতা, এই দুইয়ে মিলে, একদিন আমাদেরকে জাতি হিসাবে পঙ্গু করে দেবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, অসংখ্য মৌলবাদী জঙ্গী দেশের কোনো কাজেই আসবে না। কিন্তু যে মানুষগুলোকে এরা মুরগি কাটার মতো করে কেটে ফেলছে, তারা সবাই একেকজন সোনার টুকরো মানুষ। অকাল এবং অপঘাত মৃত্যুর কারণে শুধু এরাই যে হারিয়ে যাবে তাই নয়, মুক্ত-চিন্তার জায়গাটাতে ভবিষ্যতে আর কেউ আসতেই সাহস করবে না। আলোর শেষ রশ্মি নিভে যাবে, অন্তহীন এক অন্ধকার জগতে পতিত হবে দেশ এবং জাতি। সেই অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে আমাদের হয়তো অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে কয়েক যুগ, কয়েক শতাব্দী। মৌলবাদীরা ঠিক এই কাজটাই করতে চাইছে আমাদের সমাজটাকে নিয়ে। আলোর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে, পিছন দিয়ে হাঁটিয়ে, নিয়ে যেতে চাইছে অন্ধকার কোনো ভূবনে।

অনন্ত-র মতো যুবকেরা যে অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে আসে আমাদের জন্য, সেটাকে পরম মমতায় কাজে লাগানো উচিত আমাদের। আমাদের উচিত তাদেরকে এমন একটা নির্ভাবনাময় পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তারা সতত ফুল হয়ে ফুটতে পারবে। তার বদলে যদি এদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার সুযোগ দেই, তবে অনন্ত আক্ষেপে পোড়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই আমাদের। এই অনন্ত-র ক্ষেত্রে আক্ষেপে পুড়েছি আমরা, আত্মগ্লানিতে ভুগেছি, আত্মকষ্ট পেয়েছি। আর যেনো কখনো এমন না হয়, সেই প্রতিশ্রুতি থাকুক আজ এবেলায়।